মঙ্গোলিয়া, সাহসী মানুষের দেশে: পর্ব-২০

কৃষ্ণ হৃদয়ের নীল হ্রদে একদিন
তৃতীয় পর্ব

আমরা যে হ্রদের দিকে যাচ্ছি মঙ্গোলীয় ভাষায় মিঠা পানির এ হ্রদের নাম খার জুরখনি খুখ নুউর । ‘খার জুরখ’ কথার অর্থ হলো কৃষ্ণ হৃদয় আর ‘খুখ নুউর’ এর অর্থ হলো নীল হ্রদ , পুরোটা মিলিয়ে কৃষ্ণ হৃদয়ের নীল হ্রদ । হ্রদটি মঙ্গোলিয়ার পূর্বাঞ্চলের বিখ্যাত খেন্টি পর্বতমালার একদম শেষ প্রান্তে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ফুট উঁচু খারজুর্খ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত । যদিও হ্রদটির পানির প্রধান উৎস দুটি ভূগর্ভস্থ ঝরনা, তবে এর কাছেই রয়েছে সেনখের নামের একটা নদী । উল্লেখ করার বিষয় হলো, এই খেন্টি প্রদেশই হলো চেঙ্গিস খানের জন্মস্থান ।

এভাবে উঁচু-নিচু তৃণভূমির ওপর দিয়ে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা পাইন বনের মাঝ দিয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে। পথে একটু পর পর আমরা ছোট ছোট স্বচ্ছ পানির বহমান নহর অতিক্রম করছি । আমাদের সামনে দূরে তখন কিছু কটেজ টাইপের ছোট ছোট কাঠের ঘর দেখা যাচ্ছে । চারদিকের চত্বর আর অবকাঠামো দেখে বোঝা যাচ্ছিল এটা একটা পর্যটনকেন্দ্র; কিন্তু কোথাও কোনো জনমানুষের সাড়াশব্দ নেই। চত্বরে ঢোকার টিকিট কাটার গেট খাঁ খাঁ করছে । সারা এলাকায় একজন মানুষেরও কোনো চিহ্ন চোখে পড়লো না , অগত্যা বিনা টিকিটেই আমরা রিজার্ভড ফরেস্ট পার্কের মধ্যে ঢুকে গেলাম । আমরা মোটামুটি নিশ্চিত হলাম, আমাদের এ জগতে বাতা আর আমি ছাড়া আর কোনো জনমানুষ নেই । একসময় আমরা হ্রদের নীল পানিতে পাহাড়ের ছায়া দেখতে শুরু করলাম । আমরা তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো গাড়ি রেখে হ্রদের দিকে হাঁটতে শুরু করেছি । পাইন বনের ভেতর দিয়ে আমরা হাঁটছি আর ক্রমেই কৃষ্ণ হৃদয়ের নীল হ্রদ আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে আসছে । এভাবে প্রায় পনেরো মিনিট হাঁটার পর আমরা হ্রদের একদম পারে এসে পৌঁছুলাম । এতোদিন দেখে আসা মঙ্গোলীয় নিসর্গের সম্পূর্ণ বিপরীত এ হ্রদের পারিপার্শ্বিক নিসর্গ। চারদিকে পাহাড়ের ঢাল আর সে ঢালে পাইনগাছের সারি আর মাঝখানে নীলাভ হীরক খণ্ডের মতো জ্বলজ্বল করছে বিখ্যাত খুখ নুউর হ্রদ । শীতে হ্রদের সব পানি জমাট বেঁধে বরফ হয়ে যায়।আমার যেমন এখানে জীবনে প্রথম আসা, আমার ট্যুর গাইড বাতারও তেমন প্রথম আসা। আমরা দুজনই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছি হ্রদের দিকে । চারদিকের নমনীয় ঢালের পাহাড়গুলো যেন পরম আদরে আগলে রেখেছে মহামূল্যবান নীল হ্রদটিকে। প্রকৃতি এখানে এমনই পরিপূর্ণ যে এখানে কিছু যোগ করার অবকাশ নেই , বিয়োগ করারও অবকাশ নেই। আমি নিজেও এখন যেন সেই প্রকৃতির অংশ। এমন একটি সুন্দর জায়গায় আসতে পারার জন্য মনে মনে বারবার সৃষ্টিকর্তাকে আমার সর্বসত্তার কৃতজ্ঞতা জানালাম। এ গ্রহের সাত বিলিয়ন মানুষের মধ্যে মাত্র কিছু মানুষ এখানে আসতে পেরেছে, আমি তাদের মধ্যে একজন। এর চেয়ে বেশি আমার আর কী চাই!

হ্রদের দিকে কতোক্ষণ এমনভাবে তাকিয়ে ছিলাম মনে করতে পারি না, এভাবে পানির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই একসময় আমি ভাবছিলাম, একটা হ্রদের নাম কী করে কৃষ্ণ হৃদয়ের নীল হ্রদ হতে পারে। কৃষ্ণ আর নীল দুটি আলাদা রং কী করে একত্রে একটা হ্রদের নামের অংশ হতে পারে। তবে অনুজপ্রতিম স্থপতি আরেফিন ইব্রাহিমকে আমি যখন পরে এটা বলেছিলাম, ও একটা চমৎকার সৃজনশীল কাল্পনিক ব্যাখ্যা আমাকে দিয়েছিল। ও বলতে চাইছিল যে হয়তো বিরহের দহনে কোনো সরল কোমল হৃদয় কষ্টে কালো হয়ে গেছে আর তার সমবেদনায় লেকের পানি হয়তো দুঃখে নীল হয়ে গেছে। সত্য-মিথা জানি না, তবে আরেফিনের ব্যখ্যার পেছনে যে একটা চিরন্তন লোকজ প্রেমকাহিনির আবছা কাঠামো উঁকি দিচ্ছে সেটা আমার খুব ভালো লেগেছে ।

হ্রদের পানিতে নানা প্রজাতির অনেক বালিহাঁস ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঝাঁকে ঝাঁকে বালিহাঁস আমাদের দেখে ভয় পাচ্ছে না ,আমাদের দিকে ভ্রুক্ষেপই করছে না। হাঁসেরা অবশ্য ভ্রুক্ষেপ করে কি না আমি জানি না । ভ্রুর সঙ্গে নিশ্চয়ই ভ্রুক্ষেপের সম্পর্ক। হাঁসেদের কি ভ্রু আছে, আমি ঠিক জানি না । তবে এ হ্রদের হাঁসেরা যেহেতু মানুষ তেমন দেখে না, তাই তারা এখনো মানুষদের ভয় পেতে শেখেনি।

হ্রদের পানিতে কোনো ঢেউ নেই , নেই কোনো কম্পন । নিশ্চল নীলাভ পানির ওপর মোটেও দুলছে না ওপারের এক শৃঙ্গ উঁচু পাহাড়ের বিশাল প্রতিবিম্ব । হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, হ্রদের তীরে এক ঝোপের পাশে এক বয়স্ক দম্পতি ঘাসের ওপর বসে আমাদের মতোই নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে আছে হ্রদের দিকে । আমরা চারজনই তখন বুঝতে পেরেছিলাম, এ অপরূপ নিসর্গের সামনে কথা বলা বোধ হয় খুবই বেমানান কাজ । এখানে নৈঃশব্দ্যই সবচেয়ে বেশি বাঙ্ময় ।

কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ নিজেই নৈঃশব্দ্য ভাঙলেন। তিনি আমাদের হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন। তাঁর হাতে দেখলাম একটা ডিজিটাল ট্যাব। ট্যাব থেকে কী জানি উনি ওনার স্ত্রীকে দেখাচ্ছেন। আমাকে নানা প্রশ্ন করলেন। বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে উনি খুব অবাক হবেন ভেবেছিলাম। মঙ্গোলিয়ায় যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই মানুষের চোখে-মুখে ও কথায় অবাক হওয়ার প্রতিফলন দেখেছি বারবার;, কিন্তু এই প্রথম কাউকে বাংলাদেশের কথা শুনেও অবাক হতে দেখলাম না। বাংলাদেশ থেকে আমি মঙ্গোলিয়ার এই প্রায় জনমানবহীন অতি প্রত্যন্ত একটা জায়গায় আসব, এটা যেন খুবই স্বাভাবিক একটি নৈমিত্তিক ঘটনা । আমার বিবেচনায় দুধরনের মানুষ সহজে অবাক হয় না, একদল যারা প্রকৃত অর্থেই খুব জ্ঞানী আর অন্যদল, যাদের জীবনে ঘাত-প্রতিঘাতের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। উনি কোন দলের কে জানে। তাঁর সুঠাম চেহারা আর মুখের চামড়ার অসংখ ভাঁজের মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছিল তাতে মনে হয় উনি দুই দলের যেকোনো দলেরই হতে পারেন। চেঙ্গিস খান, মঙ্গোলিয়ার অপরূপ ভূপ্রকৃতি, মধ্যযুগের ইতিহাস, যুদ্ধের বর্বরতা ইত্যাদি বিষয় নিয়েই ওনার সঙ্গে আলাপ হলো। আমি বার কয়েক আধ্যাত্মিকতা ও ভূপ্রকৃতি নিয়ে আলাপ উঠালাম; কিন্তু দেখলাম, উনি এ আলাপে তেমন উৎসাহী নন। কথার একপর্যায়ে বলেই ফেললেন,

There is nothing called spirituality in the real world.

এ কথার পর আর কী বলার থাকে। তবে এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম ওনার বৃদ্ধা স্ত্রী   (গার্ল ফ্রেন্ডও হতে পারে) যিনি আমাদের পুরো আলাপের সময় তাঁর স্বামীর গায়ে হেলান দিয়ে বসে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ হয়ে একমনে হ্রদের পানির দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তিনি নড়েচড়ে বসে মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে তাঁর স্বামীর মন্তব্যের জবাবে বললেন,

There are other worlds besides his so called real world and spirituality is real in that world.

আমি বৃদ্ধার কথায় খুব মজা পেলাম। তাঁকে খুঁচিয়ে আরো কিছু কথা বের করে নিতে চাইলাম। কথায় কথায় তিনি বললেন, ওনারা দুজনই জিনতত্ত্ববিদ । দুজনই সুইডেনের নাগরিক, সেখানে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ করছেন বহু বছর ধরে। কথায় কথায় কিছুটা কৌতুক করে বললেন যে তাঁর স্বামী একজন পাঁড় নাস্তিক। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমিও নাস্তিক নও কেন? তিনি যা বললেন তাতে আমার সারা গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেলো। তিনি বললেন, ‘দেখো, আমি একজন জিনতত্ত্ববিদ। মানুষের দেহের জানা সব Molecular Biological কার্যক্রম আমার নখদর্পণে। যদিও না জানা বিষয়ই জানা বিষয়ের চেয়ে অনেক বেশি, তবে যতোটুকু মানুষ এখন পর্যন্ত জানতে পেরেছে তাতে একটা মানুষকে শুধু এক সেকেন্ড সময় বেঁচে থাকার জন্য তার শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্ত চলাচল, রক্তচাপ, হৃৎকম্পনসহ যে অসংখ্য অসংখ্য ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ timely Molecular synchronized actions-এর ভেতর দিয়ে যেতে হয় তা কোনো supernatural power-এর নিয়ন্ত্রণ, নির্দেশনা বা দয়া ছাড়া সম্ভব নয়। এই super synchronization শুধু তিনিই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এটা আমি বুঝি বলেই আমি ওর মতো নাস্তিক হতে পারি না।’

কিছুক্ষণ পর আমি তাঁর এ অভাবনীয় মন্তব্যের বিস্ময় কাটিয়ে উঠে ওনাকে উল্টো প্রশ্ন করলাম, উনিও তো তোমার মতো জিনতত্ত্ববিদ, উনি কি তোমার মতো সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের ব্যাপারটা অনুভব করে না?

আমার প্রশ্নের উত্তরে মৃদু একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘জ্ঞানের অহংকারই বেশির ভাগ পণ্ডিতকে অন্ধ করে তোলে। আলো যতোই তীব্র হোক চোখ খুলতে না চাইলে তুমি আলো দেখবে কী করে? বাইবেলে একটা ভার্স আছে, God resists the proud, but gives grace to the humble. আমি বাইবেলের উদাহরণ দিচ্ছি বলে তুমি আবার ভেবে বসো না আমি একজন খ্রিস্টান। আমি একজন পরম আস্তিক হলেও আমি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম মেনে চলি না।’

চেঙ্গিস খানের দেশে এসে এই চরম প্রত্যন্ত এলাকায় বসে সেই সুদূর সুইডেনের এক অচেনা-অজানা জিনতত্ত্ববিদের কাছে মানবদেহের এমন আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ শুনবো তা কোনো দিন চিন্তাও করিনি। তবে মানবদেহের মধ্যেই আধ্যাত্মিকতার তত্ত্ব এ দেশের সুফি-বাউলরা তাঁদের দেহতত্ত্বের মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। তাঁদের একটা মূল দর্শনই হচ্ছে—

যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে দেহ ভাণ্ডে।

দেহতত্ত্বের বাউলদের একদল কোরানের সুরা হামিম সিজদার ৫৩ নম্বর আয়াতকে এ ব্যাপারে তাদের প্রমাণ হিসেবে হাজির করে, তবে ক্লাসিক্যাল ইসলামী পণ্ডিতরা তাদের এ ব্যাখ্যা মেনে নেন না। সে আয়াতে বলা হয়েছে,

‘এখন আমি তাদেরকে আমার নির্দেশনাবলি প্রদর্শন করাবো পৃথিবীর দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে; ফলে তাদের কাছে ফুটে উঠবে যে, এ কোরআন সত্য। আপনার পালনকর্তা সর্ববিষয়ে সাক্ষ্যদাতা, এটা কি যথেষ্ট নয়?’

‘তাদের নিজেদের মধ্যে’ বলতে তারা দাবি করে, এখানে মানবদেহের কথা বলা হয়েছে। দেহতত্ত্বের বাউলদের কথা সব জানি না, তবে এই সুইডিশ জিনতত্ত্ববিদ যে মানবদেহের মধ্যেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের নিদর্শন খুঁজে পেয়েছেন তা তিনি তাঁর কথায়ই আমাকে খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আরো অনেক কথা হয়েছিল। একটা জিনিস দেখলাম, পুরুষ মানুষটি যখন কথা বলছিলেন তখন তাঁর স্ত্রী কোনো কথা বলেননি, আবার স্ত্রী যখন কথা শুরু করলেন তখন পুরুষ মানুষটি একটিও শব্দ উচ্চারণ করেননি। সে সময়টি তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন তাঁর স্ত্রীর মতো নিশ্চুপ হয়ে লেকের পানির দিকে তাকিয়ে। তাঁদের নিজেদের মধ্যে বোধ হয় এমনই চুক্তি করা আছে। আসলে সুখী দাম্পত্যজীবনের জন্য পারস্পরিক এমন কিছু চুক্তি থাকা ভালো এবং সে চুক্তি সর্বদা মেনে চলা আরো ভালো।

আমার আরো অনেকক্ষণ বৃদ্ধা মহিলার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে ছিল; কিন্তু বাতার তাড়নায় সেটা আর প্রলম্বিত করা সম্ভব হলো না। একপর্যায়ে আমি তাঁদের দুজনকে অনেক শুভেচ্ছা-টুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় নেওয়ার জন্য মন স্থির করছিলাম। কিন্তু ঠিক তখনই বৃদ্ধা আমাকে বললেন, ‘তুমি Spiritual Landscape নিয়ে কথা বলছিলে, আমি তোমাকে কয়েকটা লাইন পড়ে শোনাচ্ছি, শোনো।’ এই বলে তিনি তাঁর ট্যাব থেকে পড়তে লাগলেন,

So many landscapes we pass through, internally and externally, in our journey of life. I find the outer and inner often meet in a single point peacefully together when we find ourselves standing in front of the vast spiritual landscape. If you can find it, then you will be mirror of that landscape and the landscape will be the mirror of your self.

আমি তাঁকে বললাম কথাটা লিখে রাখা দরকার, তিনি বললেন, ‘লিখতে পারবো না, আমার ট্যাবে লেখা আছে, তুমি বরং ট্যাব থেকে ছবি তুলে নাও।’

আমি তা-ই করলাম।

ছবি তুলে, আমার মোবাইলে লেখাটা আবার পড়তে শুরু করলাম। কয়েকবার পড়ছি আর শুকনো পাতায় ভরা বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। আমার সামনে বাতা হাঁটছে। তার হাঁটার গতি আমার চেয়ে বেশি। কেননা তাকে এখনই আমাদের লাঞ্চের জন্য রান্না চড়াতে হবে। আমাদের দুজনের পায়ের নিচে শুকনো পাতা অদ্ভুত এক ধরনের বিরামহীন মচমচ শব্দ করে চলেছে। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে আমি অনেকটা ঘোরের মধ্যে অনেক দূর চলে এসেছি। অনেক দূর এসে হঠাৎ মনে পড়লো, চলে আসার আগে ওঁদের কাছ থেকে ঠিকমতো বিদায় নিয়ে আসা হয়নি; কিন্তু ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে, তখন আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

ততোক্ষণে বেলা প্রায় দুটো বেজে গেছে। লেকের কাছে একটা বিরাট প্রাচীন পাইনগাছের ছায়ায় বাতা তার নকডাউন টেবিল গাড়ি থেকে নামিয়ে পটাপট সেট করে ফেললো আর তার ওপর একটা ছোট ব্রিফকেসের  ভেতর থেকে তার কেরিয়েবল গ্যাস স্টোভ বের করে আমাদের দুপুরের খাবার তৈরির জন্য রান্না শুরু করে দিলো। আজকের খাবার জন্য সে এনেছে মঙ্গোলিয়ান রামেন এবং তার সঙ্গে বৈকাল হ্রদের কাছে অবস্থিত যাকে বৈকাল হ্রদের বোন বলা হয় সেই খভসগল হ্রদের সাদা মাছের লম্বা বোনলেস পেটি।

বাতাকে রান্না করতে দিয়ে আমি এই ফাঁকে অজু করে একটু দূরে আরেকটা পাইনগাছের ছায়ায় দুই রাকাত করে পরপর জোহর আর আছরের নামাজ পড়তে শুরু করলাম। আমার পেছনে হ্রদ থেকে বাতাস এসে আমার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে। ঘাসের মধ্যে অজস্র ঝিঁঝি পোকা আর ঘাসফড়িং লাফালাফি করছে। চারদিকে ঘাসের একটা অদ্ভুত মোলায়েম সুগন্ধ আর এর মধ্যেই আমি মাঝারি স্বরে আল্লাহু আকবর বলে সিজদায় আমার কপাল মঙ্গোলীয় তৃণভূমির ঘাসের নরম জমিনে ছুঁয়ে যাচ্ছি বারবার। রাসুল (সা.) বলেছেন, সারা পৃথিবী তোমাদের জন্য মসজিদ। মঙ্গোলিয়ার এই অচেনা তৃণভূমিই এখন আমার মসজিদ। নামাজ শেষ করে নরম ঘাসের ওপর বসে বসে আমি ভাবছিলাম আমিই কি প্রথম মানুষ যে এ জনমানবহীন প্রান্তরে এসে সিজদা করলাম? হয়তো হতে পারে, হয়তো আমার আগেও এখানে কেউ সিজদা করেছে। জগতের কতোটুকুই বা আমরা জানি।

নামাজ শেষে বাতার কাছে এসে দেখি দুই বাটি গরম গরম ফিশ রামেন সুপ রেডি। সুপের মধ্যে অর্ধগলিত সাদা মাছের টুকরো ভাসতে দেখে আর লোভ সামলাতে পারছি না। এতো তাড়াতাড়ি সুপ বানানো হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি। আমি সুপ খাচ্ছি আর বাতার রান্না মনোযোগ দিয়ে দেখছি। এখন সে আমার জন্য খভসগল হ্রদের সাদা মাছের পেটি খুব হালকা তেলে ভাজছে। বাতা বললো, এই মাছের নাম Tsagaan Zaga। রান্না করা মাছের সঙ্গে মসলা অতি সামান্য, অল্প কিছু আদা আর রসুনের কুচি, সামান্য লবণ, ব্ল্যাক পিপার, অতি সামান্য পরিমাণ লাল মরিচের গুঁড়া আর লেবুর রস। বাতা বললো, সে আজ লাল মরিচের গুড়ো দিয়েছে; কিন্তু তার বাবা এ মাছটি খুব ভালো রান্না করতে পারতেন, তবে তিনি কখনো লাল মরিচ ব্যবহার করতেন না। বলতে গেলে মঙ্গোলীয় খাবারে লাল মরিচের প্রচলন খুবই কম।

আমি তখন বললাম, লাল মরিচ তোমাদের না চেনারই কথা, কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের আগে সারা পৃথিবীর মানুষই তো লাল মরিচ চিনতো না। আমাদের উপমহাদেশে তখন আদা আর গোলমরিচ দিয়ে তরকারি ঝাল করা হতো।

দেখতে না দেখতে মাছের পেটি রান্না হয়ে গেলো। আমি সুপ শেষ করে গোগ্রাসে বাতার অপূর্ব রান্না করা খবসগল হ্রদের সাদা মাছ শত শত মাইল দূরের কৃষ্ণ হৃদয়ের নীল হ্রদের তীরে বসে খেতে লাগলাম। পরিবেশের কারণে কি না জানি না তবে সত্যি কথা বলতে গেলে সেদিনের অমন অপূর্ব স্বাদের রান্না আমি জীবনে খুব কম খেয়েছি।

এই হ্রদের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে এই জায়গাটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও কিন্তু অনেক । কথিত আছে, এ হ্রদের পারেই ১১৮৯ সালে সাতাশ বছরের তেমুজিন নামের এক তরুণ মঙ্গোলীয় যুবককে প্রাথমিকভাবে অনেক গোত্রপ্রধান একত্র হয়ে দালাই ইখ খান বা চেঙ্গিস খান নাম দিয়ে মুকুট পরিয়ে দিয়েছিলো । মঙ্গোল যাযাবর গোত্রসমূহের এ ঐতিহাসিক একত্রীকরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে পরিপূর্ণ হয়েছিল আরো পরে, ১২০৬ সালে। চেঙ্গিস খান হয়েছিলেন সে একক মঙ্গোলীয় জাতির একমাত্র মহানায়ক । মঙ্গোলীয় ভাষায় খান শব্দের অর্থ রাজা, মহারাজা বা মহা নেতা । চেঙ্গিস ও খান এ শব্দ দুটি আক্ষরিকভাবে অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায় ‘মহান রাজা মহাসাগর’, ইংরেজি করলে অনেকটা এমন ‘the great king ocean’ । এখন প্রশ্ন আসতে পারে, সমুদ্র থেকে বহুদূরের একটা স্থলবেষ্টিত দেশের রাজার নামের সঙ্গে কী করে মহাসাগর শব্দটি মাননসই হয়। তবে সরাসরি আক্ষরিক অর্থে না গিয়ে একজন মঙ্গোলীয়কে যদি এটা জিজ্ঞেস করা হয় তখন সে বলবে যে যেহেতু চেঙ্গিস খানের রাজত্ব পুবে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে পশ্চিমে কৃষ্ণ সাগর হয়ে প্রায় আটলান্টিকের পার পর্যন্ত আর দক্ষিণে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাই চেঙ্গিস খান হচ্ছেন মহাসাগর থেকে মহাসাগর পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন সাম্রাজ্যের মহারাজা। মনে রাখতে হবে, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের সম্রাট ছিলেন চেঙ্গিস খান। ১৯৯৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিখ্যাত ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা আর সিএনএন যৌথভাবে গত এক হাজার বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে চেঙ্গিস খানকে নির্বাচিত করে ‘ম্যান অব দ্য মিলেনিয়াম’ খেতাব দেয়। মানব ইতিহাসের গত এক হাজার বছরের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সেই চেঙ্গিস খান নামের শুরু হয়েছিলো আমাদের আলোচিত এই কৃষ্ণ হৃদয়ের নীল হ্রদের পাইনগাছঘেরা বনভূমির মাঝে, যেখানে আমি তখন দাঁড়িয়ে ঠিক সেখানেই।

তেমুজিন থেকে চেঙ্গিস খান হওয়র সেই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাকে সম্মানিত করার জন্যই ঠিক এখানেই একটি স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয়েছে। এই স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশে, প্রায় তিনশ পঞ্চাশ ফুট ব্যাসের একটি বৃত্তের চাপে চেঙ্গিস খানের রক্তধারার বিভিন্ন খানদের ছত্রিশটি কাঠের খোদাইকৃত ভাস্কর্যসহ পঞ্চাশের বেশি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। বৃত্তের চাপের মাঝখানে চেঙ্গিস খানের বাবা এসুখেই, তাঁর মা ওলেন, প্রথম স্ত্রী বোর্তের ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে, এর সঙ্গে আরো আছে চেঙ্গিস খানের প্রধান সেনাপতি সুবতাই ও আরো বিখ্যাত নয়জন সেনাপতির ভাস্কর্য। প্রতিটি ভাস্কর্যের নিচে ইংরেজি ও মঙ্গোলীয় ভাষায় তাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লেখা আছে। ভাস্কর্যগুলো প্রকারে ও খোদাইরীতিতে অনেকটা উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের কাঠের ভাস্কর্যের অনুরূপ।

সুবুতাই সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়া উচিত। সুবুতাই ছিল চেঙ্গিস খানের ডান হাত। চেঙ্গিস খানের প্রধান দশ সেনাপতির মধ্যে প্রধান। চেঙ্গিস খানের দূরদূরান্তের একের পর এক সাম্রাজ্য বিজয়ের ইতিহাস আসলে সুবুতাইয়েরই সামরিক অর্জনের ইতিহাস। সুবুতাইয়ের কিংবদন্তিতুল্য সামরিক কৌশল মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠায় প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। ১১৭০ সালে জন্ম নেওয়া সুবুতাই ছিল চেঙ্গিস খানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত, অনুগত এবং সক্ষম সামরিক নেতা।

তার নতুন নতুন অভাবনীয় সামরিক রণকৌশল ও রণনীতি সারা পৃথিবীর সমর কৌশলবিদদের আজও বিস্মিত করে। বিভিন্ন উদ্ভূত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দক্ষতার জন্য সে সুপরিচিত ছিল। তার পশ্চাদপসরণের অভিনয় বা ঘেরাও করার কৌশলের ব্যবহার শত্রুপক্ষকে চরমভাবে বিভ্রান্ত করে ফেলতো।

সুবুতাই অনেক বিশাল বিশাল সাম্রাজ্য দখল করলেও প্রাথমিকভাবে তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন ছিল খোয়ারাজমিয়ান সাম্রাজ্য বিজয়ে তার ভূমিকা, যেখানে সে শক্তিশালী পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মঙ্গোল সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং সে যুগের পৃথিবীর অন্যতম প্রধান নগর সমরখন্দ দখল করেছিল। এই বিজয়ই মঙ্গোল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় চিহ্নিত করে। এর মধ্য দিয়ে মধ্য এশিয়ার বিশাল সম্মৃদ্ধ অঞ্চলে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের নতুন দরোজা খুলে যায়, যা শেষমেশ পূর্ব ইউরোপ ও মস্কো আর দক্ষিণে বাগদাদ, ইরান, সিরিয়া এবং এদিকে আফগানিস্তানের বিশাল অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ইউরেশিয়ার বিশাল অঞ্চলসহ আধুনিক ইরান, ইরাক, রাশিয়া, ইউক্রেন ও হাঙ্গেরির অন্যান্য অঞ্চলে সফলভাবে আক্রমণ ও দখল করার কৃতিত্ব তাকে দেওয়া হয়।

সামরিক গুণের পাশাপাশি সুবুতাই চেঙ্গিস খানের প্রতি তার আনুগত্য ও তার নম্রতা, বিনয় এবং সহানুভূতির জন্যও বিখ্যাত ছিল। আজও সুবুতাইয়ের কথা, তার আনুগত্যের কথা, তার বীরত্বের কথা মঙ্গোল লোকগাথায় বারবার ঘুরেফিরে আসে। চেঙ্গিস খানের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সুবুতাই তাঁর পাশে ছিল এবং সাম্রাজ্যকে সুসংহত করতে এবং এর দখলকৃত অঞ্চলগুলো আরো সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। যে দেশগুলো সে জয় করতো তাদের প্রতি ন্যায্য আচরণের জন্য সে সুপরিচিত ছিল। এ কারণে মঙ্গোলিয়ান ইতিহাসের অন্যতম নায়ক হিসেবে মঙ্গোলদের কাছে সে আজও মহানায়ক হিসেবে পরিচিত। আমার গাইড বাতার মুখে তার নাম বারবার খুব সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হতে শুনেছি।

ইতিহাস যদি নির্মোহভাবে লেখা হতো তাহলে আলেকজান্ডার বা নেপোলিয়নের চেয়ে অনেক অনেক উঁচুতে সুবুতাইয়ের নাম লেখা হতো। কেননা এদের চেয়ে সুবুতাইয়ের সামরিক দক্ষতা আর বিস্তীর্ণ ভূমি দখলের পরিমাণ অনেক অনেক বেশি। আলেকজান্ডার ও নেপোলিয়নের তুলনায় সুবুতাইয়ের সামরিক অভিযানগুলো অনেক বড় পরিসরে ছিল, কারণ সে ইউরেশীয় মহাদেশ জুড়ে মঙ্গোল সেনাদের নেতৃত্ব দিয়েছিল।

এ ঘটনার আটশ তেত্রিশ বছর পর আজ সুদূর বাংলাদেশের আর এক ‘খান’, এই আমি, আজ দাঁড়িয়ে আছি সেই একই জায়গায়, সেই একই বনভূমির মাঝখানে, যেখানে তেমুজিন নামের সেই যুবকের নাম পরিবর্তন করে তাঁকে চেঙ্গিস খান নাম দেওয়া হয়েছিল। আমার চারদিকে সব মিলিয়ে চেঙ্গিস খানসহ প্রায় পঞ্চাশটি কাঠের খোদাইকৃত মঙ্গোলীয় খানদের ভাস্কর্য। সব মঙ্গোলীয় খানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি একা বাংলাদেশের এক নিরীহ ‘খান’। আমার মনে হচ্ছিল, পঞ্চাশজন ‘খান’ যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এ কথা যখন চিন্তা করছি তখন এক অচেনা শিহরণে আমার গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে যাচ্ছে। আটশ বছর আগের পুঞ্জীভূত ইতিহাস যেন আমার অস্তিত্বকে তখন ঘিরে ধরেছে। মনে হচ্ছিল, আমিও আস্তে আস্তে ইতিহাসের অতল ঘূর্ণিজলের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছি।

মাহফুজুল হক জগলুল
১৮ অক্টোবর,২০২২

আরও পড়ুন