মঙ্গোলিয়া, সাহসী মানুষের দেশে : প্রথম পর্ব
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৮ তারিখ ARCASIA Forum-21-এর কনফারেন্সে যোগ দিতে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবেষ্টিত দেশ ও পৃথিবীর অষ্টাদশতম বড়ো দেশ মঙ্গোলিয়ায় এসেছি। মঙ্গোলিয়ার রাজধানীর নাম উলানবাটোর। উলানবাটোর হচ্ছে পৃথিবীর শীতলতম রাজধানী।
মঙ্গোল শব্দের অর্থ হলো সাহসী। তাই মঙ্গোলিয়া হলো সাহসী মানুষের দেশ। মঙ্গোলিয়া হলো চেঙ্গিস খান, চাঘতাই খান, কুবলাই খান, হালাকু খান, বার্কা খানসহ তাবৎ খানদের দেশ। আমার নিজের নামও খান দিয়ে শুরু, তাই এরা হয়তো কেউ কেউ আমার তস্য তস্য পূর্বপুরুষ। কিন্তু আমি মোটেও সাহসী মানুষ নই, তবে আমার মুখাবয়বে একটা অস্পষ্ট মঙ্গোলয়েড ভাব আছে বলে আমার বন্ধুরা ছোটবেলা থেকেই বলে আসছে, আমার নিজেরও সেটা কিছুটা মনে হয়। আমার দাদাজানের চেহারায় সে ভাবটা ছিল আরো সুস্পষ্ট। খুব সম্ভবত সে
কারণেই কৈশোরকাল থেকেই মঙ্গোলিয়ার প্রতি আমার মধ্যে একটা অন্য রকম কল্পনার টান অনুভব করতাম। এবার আর্কেশিয়া কনফারেন্স আমাকে সুযোগ করে দিলো আশৈশব বয়ে বেড়ানো সে কল্পনাকে বাস্তবে অনুভব করার।
আকারে মঙ্গোলিয়া বাংলাদেশের প্রায় এগারো গুণ বড়ো, তবে জনসংখ্যা ৩২-৩৩ লাখের মতো। বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে যেখানে ১৩০০-১৪০০ লোক থাকে, সেখানে মঙ্গোলিয়ায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে মাত্র দুজন মানুষ বাস করে। এদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ এখনো যাযাবর শ্রেণির। তাদের কোনো নির্দিষ্ট স্থায়ী ঠিকানা নেই, ঘরবাড়ি নেই, নিজস্ব জমিজিরাত, দলিল-দস্তাবেজ, খাজনা রসিদ, খারিজ, বিএস দাগ, আরএস দাগ এসবের কিছুই নেই । তারা সারা বছর তাদের গবাদি পশুকে তাজা ঘাস খাওয়ানোর জন্য শত শত মাইল সফর করে বেড়ায়। এভাবেই অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল নীল আকাশের নিচে সীমাহীন, বৃক্ষহীন, চিহ্নহীন, বিস্তীর্ণ প্রান্তরে শত শত মাইল ঘুরে বেড়ানোই তাদের জন্মগত পেশা, নেশা, গার্হস্থ্য ও আধ্যাত্মিকতার অংশ।
উলানবাটোর খুব একটা সাধারণ দৈনন্দিন ডেস্টিনেশন নয়। তাই এখানে আসার আকাশপথের অপশন অনেক সীমিত আর ভাড়াও অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি। প্রথমে ঢাকা থেকে দুপুরবেলা থাই এয়ারে ব্যাংকক এয়ারপোর্ট, সেখান থেকে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা ট্রানজিট। আমাদের প্রায় পঁচিশ-ত্রিশজনের নাম আর পাসপোর্ট নম্বর সংবলিত একটা প্রিন্টেড কাগজে গণভিসার নির্দেশনা দেওয়া ছিল। সে কাগজটাই ছিল
একমাত্র ভরসা। আমি সবার সঙ্গে গ্রুপে যাইনি, পারিবারিক কিছু কারণে আমি একটু দেরিতে একা গিয়েছিলাম। আমাকে একা পেয়ে ব্যাংকক সুবর্ণভূমি এয়ারপোর্টের ট্রানজিট ডেস্কের কোরিয়ান এয়ারের থাই মহিলা বিমান কেরানি সেটা গ্রাহ্য করতে চাচ্ছিলেন না। না চাওয়ার কারণ আমি ‘আদম’-এর দেশের লোক, বিনা ভিসায় এমন অনেক ‘আদম’ কোরিয়ায় ঢুকেছে, এখনো টুকটাক ঢোকে। মহিলা ফোনে খুব সম্ভবত আরো বড়ো মাপের কোনো কেরানির কাছে আমার প্রিন্ট করা কাগুজে ভিসা নিয়ে কথা বলছিল আর অনেকটা বিকারগ্রস্তের মতো একের পর এক আমার দুইটা পাসপোর্টের পাতা ওল্টাচ্ছিল আর একটু পরপর আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। খুব সম্ভবত আমার চেহারায় ‘আদম ভাব’ প্রবল, তাই সে ফোনে থাই নাকি স্বরে জোরে জোরে কথা বলেই যাচ্ছিল। তবে বাপেরও বাপ থাকে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার এক নম্বর বাপ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিনরা দক্ষিণ কোরিয়ার ট্র্যাডিশনাল সমাজ ও সংস্কৃতির প্রচণ্ড ক্ষতি করলেও আমেরিকার সঙ্গে তাদের দেশের অধিপতি শ্রেণির প্রেমের কোনো কমতি নেই। সেই ১৯৫০ সাল থেকেই দক্ষিণ কোরিয়ার মাটিতে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিতে প্রায় ৪০ হাজার সৈন্য আছে। মহিলা যখন দেখলো আমার পাসপোর্টে এখনো তার বাবাজান আমেরিকার জ্যান্ত ভিসা আছে, তখন তার চেহারা বদলে গেলো, তবে ততোক্ষণে প্রায় আধাঘণ্টা ট্রানজিট ডেস্কে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার অবস্থা কেরোসিন। তখন সে তৎক্ষণাৎ তার সেই বড়ো কেরানিকে আবার ফোন করে থাই ভাষায় উত্তেজিত হয়ে শুধু বললো,
আমেরিকা-আ-আ, আমেরিকা-আ-আ।
ওই দুবার বীজমন্ত্রের মতো আমেরিকা উচ্চারণেই কাজ হলো, আমাকে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকক-সিউল আর সিউল-উলানবাটোরের বোর্ডিং কার্ড দিয়ে দিলো।
অবশেষে কোরিয়ান এয়ারে পাঁচ ঘণ্টা উড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলের দ্বীপ-এয়ারপোর্ট Incheon-এ সূর্য ওঠার আগেই অবতরণ করলাম। এয়ারপোর্টে ঢুকে দেখি প্রায় সারা এয়ারপোর্ট ঘুমাচ্ছে, এমনকি প্রায়রিটি লাউঞ্জও বন্ধ। ভাবছিলাম, লাউঞ্জে ফজরের নামাজ পড়বো, কিন্তু সে সুযোগ হলো না। মোবাইল অ্যাপে দেখলাম সিউলে সূর্য উঠতে আর মাত্র বিশ-পঁচিশ মিনিট বাকি, দেরি করার আর সুযোগ নেই।পকেট থেকে কম্পাস বের করে কিবলা বুঝে নিয়ে একটা জুতসই পরিষ্কার কোনা খুঁজে নিয়ে সেখানে নামাজ পড়ে ফেললাম।

সফরে নামাজ কমিয়ে পড়ার নিয়ম, চার রাকাতের জায়গায় দুই রাকাত ফরজ নামাজ পড়লেই হয় আর ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে সফরে সুন্নত নামাজ না পড়া যাদের মত আমি তাদের অনুসরণ করি। তবে শুধুমাত্র ফজরের সুন্নত দুই রাকাত আমি পড়ি। কেননা সফরে রাসুল (সা.) তাই করতেন। পৃথিবীর বড়ো এয়ারপোর্টগুলো হচ্ছে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির মানুষের বাধ্যতামূলক সম্মিলনের ক্ষেত্র। তাই নামাজ পড়তে গেলেই অনেক অবাক, বিস্মিত, বিরক্ত বা সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত চোখ নামাজ পড়াটা লক্ষ করে। বিশেষ করে সিজদায় গেলে নামাজ সম্বন্ধে ধারণা নেই এমন সংস্কৃতির অনেক নারী-পুরুষই প্রচণ্ড ধাক্কা খায়। তারা বুঝতেই পারে না, এ ব্যাটা এমন আধুনিক পরিবেশে চকচকে গ্রানাইট না কার্পেট ফ্লোরের ওপর আদিম মানুষদের মতো অমন মাথা ঘষছে কেন। এদের মধ্যে যারা এরই মধ্যে পশ্চিমা টিভি বা সংবাদপত্র পড়ে অনেক জ্ঞান অর্জন করে ফেলেছে, বিশেষ করে যারা ফক্স নিউজের ভক্ত তারা বালবাচ্চা নিয়ে ভয় পেয়ে সেখান থেকে দ্রুত সরে পড়ে। কেননা তাদের ধারণা, এভাবে সিজদা দেওয়া লোকজন খুবই ডেঞ্জারাস টাইপের টেররিস্ট হয়ে থাকে।
বহু বছর এগুলো সহ্য করতে করতে এখন আমি এসবে আর তেমন বিব্রত বোধ করি না। তবে একটু পরে বোকা সাজলাম, নিজের ওপর রাগও হলো। কেননা একটু পরেই আবিষ্কার করলাম Inceon এয়ারপোর্টের চতুর্থ তলায় খুব সুন্দর একটা মুসলিম প্রেয়ার রুম আছে।
অবশেষে কাটায় কাটায় সকাল ৭টায় প্রায়রিটি লাউঞ্জ খুললো। হুড়মুড় করে পেটপুরে সকালের ফ্রি নাশতা খেতে সবাই লাউঞ্জে ঢুকে পড়লো। আমিও একই কাজ করলাম। কেননা ততোক্ষণে খুব খিদে পেয়েছে। নাশতা সেরে Inceon এয়ারপোর্টে সর্বমোট চার ঘণ্টা ট্রানজিটের পর তিন ঘণ্টা উড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চার হাজার ফুট উঁচু উলানবাটোর শহরের চেঙ্গিস খান আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে অবতরণ করলাম। প্লেনে আমার পাশের সিটেই পেলাম ২২ বছরের তরুণ এক মঙ্গোলীয়কে। ওর নাম তমরবাতার। বললো, ওর দাদা ওর এমন পুরোনো স্টাইলে নাম রেখেছে, যার অর্থ হলো হিরো। ও এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন থেকে। বছরে তিন মাস সে নাকি বোস্টনে চাকরি করে আর নয় মাস উলানবাটোরে অ্যাকাউন্টিং নিয়ে পড়াশোনা করে। যদিও সে বোস্টনে কাজ করে কিন্তু তার ইংরেজি ছিল ভয়াবহ রকমের দুর্বোধ্য। এই ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে সে কী করে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি করে আমি বুঝতে পারলাম না। আর আমিও বা কী করে তার সঙ্গে ঘণ্টা দুয়েক আলাপ চালিয়ে গেলাম, সেটাও পরে আমার নিজের কাছেই আজগুবি লেগেছে।
মঙ্গোলিয়ার সমাজ, রাজনীতি, বিশেষ করে তাদের দেশের দুই বিশাল প্রতিবেশী চীন আর রাশিয়ার তাদের রাজনীতিতে সুস্পষ্ট হস্তক্ষেপ আর তাদের রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতিগ্রস্ততা এবং চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে দেশের স্বার্থ বিক্রি করে দেওয়া, এসব নিয়ে সে অনবরত ক্রুদ্ধ আলাপ চালিয়ে গেলো আমার সঙ্গে। আমি মনে মনে হাসছিলাম, কিন্তু মুখে কিছু বলিনি। কেননা আমরাও জানি, বিশাল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দ্বারা পরিবেষ্টিত আমাদের উপমহাদেশে অনেক ছোট রাষ্ট্রের অনেকের গল্প ওর বলা গল্পের সঙ্গে অনেকটা মিলে যাচ্ছিল।
উলানবাটোর এয়ারপোর্টে যখন পৌঁছুলাম তখন সকাল ১১টা। পুরো মঙ্গোলিয়ার জনসংখ্যা ত্রিশ লাখের একটু বেশি আর এর অর্ধেকই এই উলানবাটোর নগরে থাকে। এয়ারপোর্টটা দেখলাম খুব পরিপাটি। পরিষ্কার কার্পেট টাইলস ফ্লোর, নানা ডিজাইনের সুন্দর এলইডি লাইটিং আর এর সঙ্গে মঙ্গোলিয়ার উজ্জ্বল আকাশের আলোও ট্রান্সপারেন্ট রুফ দিয়ে খুব সুন্দরভাবে আনার ব্যবস্থা হয়েছে। সবচেয়ে সুন্দর লাগলো এর আধুনিক সাইনেজ ব্যবস্থা আর ইমিগ্রেশন কাউন্টার। সব কিছুই পরিচ্ছন্ন আর ওয়েল ডিজাইনড। ভেবেছিলাম, গরিব দেশ মঙ্গোলিয়া, যার মাথাপিছু আয় আমাদের চেয়ে কম তাদের এয়ারপোর্ট আমাদের মতো নোংরা আর বীভৎস ধরনের অপরিপক্ব সাইনেজ আর ইন্টেরিয়র ডিজাইন সংবলিত হবে। কিন্তু প্রথম দর্শনেই ওদের এয়ারপোর্টের পরিমিত সৌন্দর্যে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম আর একই সঙ্গে কষ্ট লাগতে লাগলো আমাদের দেশে এতো আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত স্থপতি থাকার পরও ঢাকা এয়ারপোর্টের কী করুণদশা তা চিন্তা করে। আফ্রিকায় অনেক গরিব দেশ আছে, সেসব দেশে আমি যাইনি, তবে আমার মনে হয় ঢাকা এয়ারপোর্টের মতো এতো অসুন্দর আর বিশৃঙ্খল এয়ারপোর্ট পৃথিবীর আর কোথাও নেই, যে এয়ারপোর্টে সাধারণ যাত্রীর চেয়ে ভিআইপি যাত্রী বেশি আর সর্বমোট যাত্রী সংখ্যার চেয়ে দালালের সংখ্যা বেশি।
উলানবাটোর এয়ারপোর্টে আমার প্রথম কাজ অ্যারাইভাল ভিসা নেওয়া। যথারীতি ভিসাকক্ষে মঙ্গোলিয়ান ইউনিয়ন অব আর্কিটেক্টস থেকে ইমেইলে দেওয়া লিস্টে আমার নাম দেখলাম। আমি ভয়ে ভয়ে ছিলাম দেরিতে আসায় এরা এটা মেনে নেয় কি না নেয়। একজন অত্যন্ত মোটা বালিকা চেহারার খুব সাজগোজ করা বয়স্কা মহিলা আমার কাগজটা নিলেন, কিন্তু কিছু দেখলেন বলে মনে হলো না। আমাকে চার-পাঁচ পাতার একটা ফর্ম ধরিয়ে দিয়ে ফিলআপ করতে বললেন। আমি খুব আস্তে আস্তে সতর্কভাবে ফর্ম ফিলআপ করতে লাগলাম,
কিন্তু একটু পরে বালিকা চেহারার ওই মহিলা অফিসার বিরক্ত হয়ে বললেন,
পটাপট সবগুলায় ‘নো’ টিক মেরে দাও।
তার বডি ল্যাংগুয়েজে তিনি মনে হয় বোঝাতে চাচ্ছিলেন যে এসবের কোনো মূল্য নেই, যা পারো একটা কিছু লিখে বিদেয় হও বাবা, কেউ এগুলা পড়বে না।
আমি তার কথামতো তাড়াতাড়ি টিকটুক দিয়ে আর তার সঙ্গে পঁচানব্বই ডলার ফি দিয়ে ভিসা নিয়ে বেরিয়ে এলাম। সব মিলিয়ে বড়োজোর ছয়-সাত মিনিটেই কাজ শেষ। আমি জানি না, আমাদের এয়ারপোর্টে অ্যারাইভাল ভিসা কয় মিনিটে দেওয়া হয়।
লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই দেখি আমার নাম লিখে UMA-এর (Union of Mongolian Atchitects) বিশাল সাইজের চওড়া কাঁধ, পেশিবহুল কুস্তিগির টাইপের এক মানুষ দাঁড়িয়ে। আমি আগে থেকেই জানতাম মঙ্গোলিয়ান পুরুষদের প্রধান স্পোর্ট হচ্ছে তিনটি; কুস্তি, ঘোড়দৌড় আর আর্চারি (আর্চারির বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে পেলাম না)। তাই এমন একজন কুস্তিগিরকে অপেক্ষা করতে দেখে তেমন অবাক হইনি। আমি তার চোখে চোখ রেখে স্মিত হাসি দিতেই সেও জেন্টেল জায়ান্টের মতো খুব অমায়িকভাবে হেসে আমার হাসির প্রতিউত্তর দিলো। দুর্ধর্ষ চেঙ্গিস খানের দেশে আমাদের দুজনের প্রথম পরিচয় আর ভাববিনিময়ে কোনো বাক্য বা শব্দের প্রয়োজন হলো না।
বিনা বাক্যব্যয়েই সে অনেকটা জোর করেই আমার লাগেজ ট্রলিটা নিয়ে ঠেলতে লাগলো। দেখতে বিশাল কুস্তিগিরের মতো মনে হলেও একটু পরেই জানতে পারলাম সে আসলে কুস্তিগির না, সে একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। রাশিয়া থেকে গ্র্যাজুয়েশন ও মাস্টার্স করেছে, নাম ডাংগাসুরেন ডাংগা। চেঙ্গিস খানের দেশের মানুষের নাম এমন ভয়াবহ হবে এটার জন্য মনে হয় আমি অবচেতনভাবে প্রস্তুতই ছিলাম। তাই সঙ্গে সঙ্গেই আমি বললাম,
আমার নাম খান। খান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক। আমি তোমাদের চেঙ্গিস খানের আত্মীয়।
সে আমার শুষ্ক রসিকতা বোধ হয় ধরতে পারলো না, বরং সে খুব সিরিয়াসলি মাথা নাড়িয়ে বললো,
ইয়েস, ইয়েস। ওয়েলকাম টু মঙ্গোলিয়া। তোমার হোটেলে পৌঁছাতে দুই ঘণ্টা লাগবে, টয়লেট দরকার হলে সেরে আসো।
আমি বললাম,
টয়লেটের আগে আমার সিম কার্ড দরকার আর দরকার ডলার ভাঙানো।
ডাংগা সাহেব আমার সব কিছু খুব যত্নের সঙ্গে করে দিলেন। কোন প্যাকেজের সিম কার্ড আমার জন্য সবচেয়ে ভালো হবে তা নিয়ে অনেকটা সময় গবেষণা করার পর আমাকে সেই নির্দিষ্ট সিম কার্ড কিনতে বললেন। ততোক্ষণে ৩০০ ডলার ভাঙিয়ে আমি মহা বিপদে আছি।
কেননা ৩০০ ডলারের বিনিময়ে আমি পেয়েছি প্রায় সাড়ে নয় লাখ তুঘরিক। সবচেয়ে বড়ো নোট হলো বিশ হাজার তুঘরিকের, আমার হাতে প্রায় সবই এই বিশ হাজারের নোট। কিন্তু তাতেও আমার মানিব্যাগে যে পরিমাণ পেপার কারেন্সি ধরার কথা তার বহু গুণ হাতে পাওয়া এই তুঘলকি তুঘরিকে মানিব্যাগসহ আমার প্যান্টের দুই পকেটও ভরে ফেলে ভীষণ অস্বস্তিতে আছি। সিম কার্ড কিনে কিছু কমাতে পারলেও আনন্দ। কিন্তু সে আনন্দ আর পাওয়া হলো না, সিম কার্ডের দাম অস্বাভাবিক কম। পনেরো দিনের আনলিমিটেড ডাটাসহ সিম কার্ডের দাম মাত্র পাঁচশ টাকার কাছাকাছি আর সাত দিনের প্যাকেজের দাম তিনশ টাকার মতো।
ডাংগা সাহেব নিজেই ট্রলি ঠেলে পার্কিংয়ে তার বিরাট চকচকে কালো রঙের এসইউভিতে আমার দুটো লাগেজ ওঠালেন। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, ডাংগা সাহেবের গাড়ির স্টিয়ারিং আমাদের মতো ডান দিকে, কিন্তু গাড়ি চলছে আমেরিকার মতো ডান পাশ দিয়ে। ইংল্যান্ড,
পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশসহ কমনওয়েলথ দেশগুলোতে গাড়ির স্টিয়ারিং থাকে গাড়ির ডানে আর গাড়ি চলে রাস্তার বাম দিক দিয়ে, এভাবে পৃথিবীর মাত্র ৩০%-৩৫% দেশে গাড়ি চলে। অন্যদিকে আমেরিকা, রাশিয়া, চীনসহ সমগ্র মূল ইউরোপে গাড়ির স্টিয়ারিং থাকে বাম দিকে আর গাড়ি চলে ডান দিক দিয়ে। কিন্তু মঙ্গোলিয়ায় দেখলাম অবাক ব্যাপার, উপরোক্ত ওই দুই ট্রাফিক সিস্টেমেরই এক জটিল মিক্সচার। তবে বেশির ভাগ বাসে আবার স্টিয়ারিং বাম দিকে থাকতে দেখেছি । পরে অবশ্য জেনেছি, শুধুমাত্র ডান হাতে চালিত জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি বজায় রাখার স্বার্থেই এই অদ্ভুত ট্রাফিক সিস্টেম বজায় রাখা হয়েছে।
গাড়িতে কথায় কথায় জানলাম, যাকে কুস্তিগির ভেবেছিলাম সেই ডাংগা সাহেব উলানবাটোরের বড়ো কনস্ট্রাকশন কোম্পানির এমডি। বুঝতে পারলাম মঙ্গোলিয়ান আর্কিটেক্টদের ইউনিয়ন তাদের কন্ট্রাক্টরদের জড়িত করেছে ডেলিগেট আনা-নেওয়ার কাজে। আমরা বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটে বহুবার স্থপতিদের নানা রকমের আন্তর্জাতিক সেমিনার বা সম্মেলনের আয়োজন করেছি, কিন্তু সব কিছুই আমরা এ দেশের নবীন ও প্রবীণ স্থপতিরা মিলেমিশে করেছি। কখনো কন্ট্রাক্টর বা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি দিয়ে আমরা কোনো অনুষ্ঠান করিনি। এ কারণেই সারা পৃথিবীতে আন্তরিকতার সঙ্গে অনুষ্ঠান আয়োজনে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের এতো সুনাম।
(চলবে, ইনশাআল্লাহ…..)
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২


