মঙ্গোলিয়া, সাহসী মানুষের দেশে : দ্বাদশ পর্ব

চারটা Duuble Whopper burger with extra cheese আর চারটা কফি আসার কথা, কিন্তু দেখলাম অন্যের পয়সায় অর্ডার দেওয়ার বেলায় বুর্জিগিন মহা দিলদরিয়া। ব্রাউন পেপার ঠোঙা থেকে যা যা বেরোলো এখানে তার তালিকা দিচ্ছি,

৫টা Duuble Whopper burger with extra cheese
৩ প্যাকেট buffalo wings
(নামে buffalo হলেও মহিষের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এটা আসলে ডিপ ফ্রাই করা মুরগির ডানা। নিউ ইয়র্ক থেকে কিছুটা দূরে বাফেলো শহরে এর উদ্ভব বলে এই নাম )
৩ প্যাকেট Potato Wages
(আলুকে কোনাকুনি করে কেটে ভাজা)
৫ পিস Lemon tart
আর ৫টা বড়ো কাগজের গ্লাস ভর্তি কফি

বোঝাই যাচ্ছে, ওরা আমাকে মক্কেল বানিয়ে ছেড়েছে। আমি পকেট থেকে মঙ্গোলীয় তুঘরিক বের করে ডেলিভারি বয়কে দিলাম। তাকে কিছু বকশিশও দিলাম; কিন্তু তার মধ্যে চলে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখলাম না। দেখলাম, সেও এদের সঙ্গে হাসিঠাট্টায় মশগুল হয়ে আছে। আমার বুঝতে বাকি রইলো না যে এরা আসলে সবাই একে অপরের পরিচিত একই সিন্ডিকেটের সদস্য।
খুব আয়েশ করে খাবার পর্ব শুরু হলো। প্রথমেই খুব সমাদর করে আমার দিকে একটা বার্গার আর অন্য সব কিছুও এগিয়ে দেওয়া হলো।

আমি বললাম,

আমার খিদে নেই, আমি কিছু খাবো না।

সঙ্গে সঙ্গে চিনুয়া বললো,

তুমি কী চাও আমাদের সবার কারাদণ্ড হোক?

আমি বললাম,

রাত তিনটার সময় আমি এ ধরনের মশকরা মোটেও উপভোগ করছি না। আমার খাওয়া না খাওয়ার সঙ্গে তোমাদের কারাদণ্ডের কী সম্পর্ক?

তুমি চেঙ্গিস খানের ‘ইয়াশা’ বা ‘ইহি যাশাগ’ সম্পর্কে কিছুই বোধ হয় জানো না, তাই এমন কথা বলার সাহস পাচ্ছো।

ইয়াশা আবার কী বস্তু?

ইয়াশা শব্দের অর্থ হলো আইন বা বিধি। ইয়াশা হলো চেঙ্গিস খান প্রদত্ত বিখ্যাত মৌখিক আইন। এ আইনে বলা আছে, যদি কোনো মানুষ অন্য কোনো মানুষের সামনে খাবার খাওয়ার সময় তাকে খাবারের জন্য আমন্ত্রণ না করে তাহলে তাকে কঠিন শাস্তি দিতে হবে এবং একজন পর্যটক বিনা আমন্ত্রণে ও বিনা অনুমতিতে যে কারো খাবারে ভাগ বসাতে পারবে তখন, যদি তাকে কেউ বাধা দেয় তবে যে বাধা দেবে তাকেও কঠিন শাস্তি দিতে হবে।

অনেক আইনই তো করা যায়; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আইনকে সমাজে ককোটুকু প্রয়োগ করা যাবে এবং জনগণের চেতনায় সেটা গ্রহণযোগ্য হবে কি না। জনগণের ওপর প্রচণ্ড কর্তৃত্ব এবং নেতার ওপর জনগণের শতভাগ আস্থা না থাকলে কোনো নেতাই এমন আইন করার সাহস পেতো না। চেঙ্গিস খানের সে কর্তৃত্ব এবং তাঁর ওপর জনগণের সে আস্থা ছিল বলেই তিনি এ আইন কার্যকর করতে পেরেছিলেন।

ওর কথায় আমি একটা ধাক্কা খেলাম। রক্তপিপাসু অর্ধ বর্বর চেঙ্গিস খান এমন একটি মানবিক আইন করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর আট শতাব্দী পরও মঙ্গোলরা তা মেনে চলছে, সেটা জেনে আমি খুব অবাক হলাম।

ধাক্কা সামলে আমি ওকে বললাম, শোনো, তোমার যেমন ইয়াশা আছে, আমারও তেমন ইয়াশা আছে। তোমার ইয়াশা মৌখিক বিধান আর আমার ইয়াশ হলো লিখিত ঐশ্বরিক বিধান। আমার ইয়াশা আমাকে বলেছে হালাল ছাড়া অন্য কোনো মাংস না খেতে। তোমার ওই বিফ আর মুরগির মাংস আমার জন্য হালাল না। তাই আমি সেটা খেতে পারবো না।

আমি যেমন বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ইয়াশা আবার কী বস্তু, ও তেমন একই রকম বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

হালাল আবার কী বস্তু?

আমি একটু দম নিলাম। ভিনদেশে এসে এই গভীর রাতে হালালের শরিয়তি মাসালা নিয়ে আলাপ করার ইচ্ছে আমার মোটেই হচ্ছিলো না। আমি এখানে এসেছি গল্প শুনতে, লেকচার দিতে নয়। কিন্তু এর ব্যাখ্যা না দিলে তো খাওয়াদাওয়া শুরু হচ্ছে না, প্রচণ্ড শীতে খাবারগুলো ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। কেউ খাবারে হাতই দিচ্ছে না। সবাই অনেক আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার মুখের দিকে।

আমি তখন বললাম,

শূকর ছাড়া তৃণভোজী চতুষ্পদ প্রাণী যাদের দাঁত সুচালো নয়, যাদের নখর নেই ও হিংস্র নয় এমন পশু ও হিংস্র নয় এমন পাখির মাংস মুসলিমদের জন্য হালাল, অর্থাৎ এদের মাংস খাদ্য হিসেবে অনুমোদিত।

চিনুয়া সঙ্গে সঙ্গে বললো, বার্গারের গরুর মাংস আর ওদিকে মুরগির মাংসের ফ্রাই তো তাহলে তোমার জন্য বৈধ। তুমি খাচ্ছো না কেন? নাকি তুমি মনে করেছো মঙ্গোলিয়ান গরুদের পায়ে নখর আছে আর এরা বাঘের মতো হিংস্র?

একের পর এক ওর প্রশ্ন আর বিদ্রুপের জবাব দিতে দিতে আমি তখন খুব ক্লান্ত বোধ করছিলাম। আমি বললাম, আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান আছে আমাদের ইয়াশায়, সেটা হচ্ছে যে শুধু খাওয়ার জন্য অনুমোদিত যেকোনো পশু ও পাখিকে হত্যা করা যাবে, তবে হত্যা করার আগে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে হবে, অর্থাৎ তার অনুমতি নিতে হবে। তোমার খাবারের মাংস যে প্রাণী থেকে এসেছে তাকে হত্যা করার সময় সৃষ্টকর্তার অনুমতি নেওয়া হয়নি।

চিনুয়া এবার হো হো করে হেসে উঠে বললো, এমন সামান্য একটা অনুমতির জন্য তুমি এই সুস্বাদু খাবার খাবে না? ভেরি সিলি, ভেরি সিলি।

মোটা ভাইজানও সামনে-পেছনে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বলে উঠলো,

Yes, yes.

আমার কাছে এটা মোটেও সামান্য নয়। আমি বরং আমার ধর্ম মেনে চলছি, তুমি তোমার ধর্ম মেনে চলছো না। তুমি আমাদের ভূখণ্ডের মানুষ মহামতী বুদ্ধের অনুসারী, যদিও তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মাচারের সঙ্গে মূলধারার বৌদ্ধ ধর্মের অনেক পার্থক্য আছে, তবু বুদ্ধের শিক্ষা অনুযায়ী,
পাণাতি পা-তা মাহাপাপো

অর্থাৎ, জীব হত্য মহাপাপ, কিন্তু তুমি জীব হত্যা করেই ক্ষান্ত না, তাকে আবার তেলে ভেজে বার্গার বানিয়ে খাওয়ার জন্য ওকালতি করছো।

আমার কথায় চিনুয়া মনে হয় খুব ধাক্কা খেলো, একদম চুপ করে রইলো অনেকক্ষণ । এতো গরম গরম তুলনামূলক ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের পর হঠাৎ আড্ডার মধ্যে এমন একটা আকস্মিক নীরবতায় কেমন জানি অসহনীয় অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। ওদিকে প্রচণ্ড শীতে খাবারও দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

এদের মধ্যে বয়সে আমি সবার চেয়ে বড়ো, সে কারণে আমার দায়িত্ব সবার চেয়ে বেশি। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বললাম,
আমাকে লেমন টার্ট, পটেটো ওয়েজেজ আর কফি দাও। এগুলো খেতে আমার ইয়াশায় কোনো বাধা নেই।

মোটা ভাইজান আমার কথায় মনে হয় খুব খুশি হলো, আগের মতোই মাথা দুলিয়ে আবার বললো,

Yes, Yes.

আমার কথায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসতে শুরু হলো। বুর্জিগিন খাবার ভাগাভাগি শুরু করে দিলো। এর মধ্যে দেখি দারোয়ান বাতুও ঘুম থেকে উঠে আমাদের খাবারে ভাগীদার হওয়ার জন্য আমাদের আশপাশের ঘুরঘুর করছে। বুর্জিগিনসহ ওরা চারজন, ডেলিভারি ম্যান, বাতু আর আমি। আমরা মোট সাতজন এই গভীর রাতে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে সকলে মিলে আমাদের খাবার ভাগাভাগি করে নিয়ে এক অদ্ভুত ধরনের ভোজসভায় যোগ দিলাম। দ্য ভিঞ্চির লাস্ট সাপারে মোট ছিলো তেরোজন আর আমাদের এ মঙ্গোলীয় সাপারে আমরা হলাম সাতজন। আনলাকি থার্টিনের বিপরীতে লাকি সেভেন।

চিনুয়া শুধু বললো, ইয়াশা বা ইহি যাশাগ খুব ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট, সেখানে চেঙ্গিস খান বিভিন্ন ধরনের আইন তৈরি করেছিলেন। সে আইনের তালিকা অনেক লম্বা। সেখানে অনেক অসাধারণ আর মজাদার আইন আছে, তোমার WhatsApp-এ আমি সেগুলো আগামীকাল পাঠিয়ে দেবো।
এই বলে চিনুয়া খাবারে মনোযোগ দিলো। অবাক হয়ে দেখলাম, তিনতলা উঁচু বার্গার খাওয়ার জন্য যে এতো শর্ত দিয়ে এতো রাতে আমার কাছে এসেছে সে তার বার্গারটা দারোয়ান বাতুকে দিয়ে দিলো আর তার ভাগের অন্য খাবার সেই ডেলিভারি বয়কে দিয়ে নিজে সিগারেট ধরিয়ে শুধু কফি খেতে লাগলো। এ রকম অনন্য চরিত্রের মানুষ আমি আরো দেখেছি যারা নানা পদের খাবার আয়োজনের জন্য জান কোরবান করে দেয়, নানা রকম খাবার সাজিয়ে রেখে সবাইকে খাওয়ায়, কিন্তু নিজে খায় খুবই সামান্য।

কফিভর্তি কাগজের গ্লাস উঁচিয়ে ধরে চিনুয়া বললো, শীতের রাতে এ রকম বড়ো এক গ্লাস কফি হাতে পেলে সারা পৃথিবীতে এর চেয়ে টেস্টি আর কী আছে।

আমি বললাম,

সারা পৃথিবী নিয়ে বোলো না, পৃথিবী অনেক অনেক বড়ো। সারা পৃথিবীর মানুষের কফি খাওয়ার টেস্ট ও ধরন এক নয়।

চিনুয়া একটু বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকালো, সিগারেটে কয়েকটা খুব দ্রুত আধাআধি টান মেরে বললো,

সেটা কী রকম?

আমি বললাম, খুব সম্ভবত কফি বিনের প্রথম আবিষ্কার হয় ইথিওপিয়ায়, তবে পঞ্চদশ শতাব্দীতে কফিকে পানীয় হিসেবে প্রথম পান করা শুরু করেন ইয়েমেনের সুফি-সাধকরা। সুফিরা মনে করতেন, কফি পান করলে তাঁদের আধ্যাত্মিকতার দৃষ্টি খুলে যাবে, নামাজ বা মোরাকাবায় (ধ্যান) কনসেন্ট্রেশন অনেক ভালো হবে। রমজানের সময় সারা রাত জেগে থেকে প্রার্থনা করতে কফি অনেক সাহায্য করতো। অনেক সুফি বিশ্বাস করতেন, কফির মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে spiritual intoxication কার্যকর হয়।

ষোড়শ শতাব্দীতে তুর্কিরা যখন ইয়েমেন তাদের অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে নেয়, তখন সেখান থেকে কফি খাওয়া শিখে তা সারা ইউরোপে ছড়িয়ে দেয় আর সেখান থেকেই কফি পরবর্তী সময়ে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছে। আর তুমি সেই উত্তর আমেরিকার স্টাইলে গ্লাসভর্তি কফি খাচ্ছো। কিন্তু তুমি যদি খানদানি কোনো ইউরোপীয়কে এই গ্লাসভর্তি কফি খেতে বলো তবে সে বলবে এটা pure horse shit. ওরা হেসে লুটিয়ে পড়ে বলবে গাধা ছাড়া এমন বিরাট গ্লাসে কেউ কফি খায় না। ওরা তোমার এ কফির চেয়ে অনেক বেশি ঘন কফি খাবে, তবে সেটা খাবে চায়ের কাপের চেয়েও অনেক ছোট কাপে, মনে হবে যেন মূল্যবান গলিত স্বর্ণ খাচ্ছে, অমন ভোমা সাইজ গ্লাস পরিমাণ কফি তারা একত্রে কখনো খাবে না। ইউরোপীয়রা মনে করে আমেরিকানরা অন্যান্য ক্লাসিক্যাল জিনিসের মতো কফিরও সফিস্টিকেসি নষ্ট করে ফেলেছে। বিখ্যাত Starbucks কফি নিয়ে ইউরোপীয়রা বলে—It is usually burnt and bitter, or just a daily overload of flavoured sugar and fat. তুমিও এই গ্লাসভর্তি কফির প্রশংসা করে আসলে আমেরিকার কফি স্টাইলকেই অনুমোদন দিচ্ছো।

আমার কথা শেষ হতে না হতে চিনুয়া প্রশ্ন করার জন্য মুখিয়ে রইলো, আমি ভেবেছিলাম ও কফি প্রসঙ্গে কথা বলবে; কিন্তু ও কফি নিয়ে একটি কথাও বললো না, বরং ও জিজ্ঞেস করলো, ‘নামাজ, মোরাকাবা আর সুফি-সাধক—এ জিনিসগুলো কী, আমাকে বুঝিয়ে বলো।’

আমি দেখলাম এ তিনটি জিনিস নিয়ে এখন ওয়াজ-নসিহত করতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে আর ওকে যা শোনার জন্য এতো রাতে এখানে আনা হয়েছে তার কিছুই শোনা হবে না। আমি ওকে আর কথা বাড়াতে না দিয়ে বললাম যে আমি ওকে WhatsApp-এ এব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য পাঠিয়ে দেবো, এখন আর এসব নিয়ে আলাপ করার দরকার নেই।

মোটা ভাইজান এই প্রথম আমাকে সমর্থন জানিয়ে বললো,

Yes, yes.

ভাইজানের সমর্থন এই প্রথম আমার কাজে লাগলো, আমিও ওকে উৎসাহ দিয়ে বললাম,

Yes, yes.

দুদিকের এতো ইয়েস ইয়েস ধ্বনির কাছে চিনুয়া হার মানলো, কিছুক্ষণ ঝিম ধরে বসে থেকে নতুন একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে শুরু করলো মঙ্গোলদের আধ্যাত্মিকতা ও পারলৌকিক বিশ্বাস নিয়ে ওর ঘরোয়া লেকচার । দীর্ঘক্ষণ ধরে ও যা বলেছিলো তা হুবহু মনে রাখতে পারিনি, তবে যতোটুকু মনে রাখতে পেরেছি ও নোট করে নিয়েছি তা নিজের ভাষায় এখন গুছিয়ে নিয়ে লিখছি :

হাজার বছর ধরে আমরা যাযাবর মঙ্গোলরা সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। আমাদের নিজস্ব লৌকিক ধর্ম, অনুশাসন আর একদমই নিজস্ব আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে একধরনের অলিখিত নমনীয় ধর্মবোধ ও পারলৌকিক চিন্তাচেতনা আমরা গড়ে তুলেছি। যেহেতু আমাদের লৌকিক ধর্মের কোনো নির্দিষ্ট লিখিত ধর্মগ্রন্থ নেই, তাই আমাদের এই ধর্মবিশ্বাস চর্চায় অঞ্চল-নির্বিশেষে নানা রকম বিচিত্র উপাদান সংযুক্ত ও বিযুক্ত হয়েছে। সে কারণে আমাদের এই লৌকিক ধর্ম যাকে আমাদের ভাষায় বলে ‘বু মোরগোল’, ইংরেজিতে যাকে কখনো Shamanism বা Tengrism এই নামে ডাকা হয়, তার একদম পরিশীলিত কোনো স্থবির রূপ নেই। মঙ্গোলরা বিশ্বাস করে, প্রত্যেকটি মানুষই জন্মগতভাবে মুক্ত আর সমান, মাথার ওপরের আকাশই তাদের স্বর্গ, তাদের দেবালয়, এই আকাশই নির্মাণ করে তাদের চেতনা ও তাদের অস্তিত্ব। একই সঙ্গে মঙ্গোলরা এর আপাত বিপরীত জিনিসও বিশ্বাস করে আর সেটা হচ্ছে, স্বর্গ চেঙ্গিস খানকে জন্ম দিয়েছে সম্রাট হওয়ার জন্য, মঙ্গোলদের শাসন করার জন্য। চেঙ্গিস খান তাই মঙ্গোলদের কাছে ঈশ্বরের পুত্র এবং একমাত্র তাঁরই আধিকার ছিল মঙ্গোলদের শাসন করার।

যদিও তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্ম নেপাল ও মধ্য এশিয়া হয়ে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় আগেই মঙ্গোলিয়ায় প্রবেশ করেছে, তবে পঞ্চদশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত সেটা সীমাবদ্ধ ছিল প্রধানত শাসক ও এলিট শ্রেণির মধ্যে। সাধারণ যাযাবর মঙ্গোলদের মনস্তত্ত্বের মধ্যে এই বু মোরগোল বা লৌকিক ধর্মই প্রাধান্য বিস্তার করে রয়েছে চিরকাল। এ কারণে কুবলাই খানের আমলে তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে ঘোষণা দিলেও তার ইউয়ান সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গোলরা আবার প্রায় এক শতাব্দীরও কম সময়ের মধ্যে তাদের পুরনো লৌকিক ধর্মে ফিরে আসে।

আগেই বলেছি, মঙ্গোলদের লৌকিক ধর্মে তাদের প্রধান দেবতা হচ্ছে আকাশ। এই আকাশকে কেন্দ্রে রেখেই তারা সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পানি, পাহাড়, বৃক্ষসহ প্রকৃতির সব কিছুর মধ্যেই স্বর্গীয় আত্মার অস্তিত্ব আছে বলে বিশ্বাস করতো আর তারই উপাসনা করতো। আমাদের কোনো উপাসনালয় ছিল না এবং আমাদের কোনো উপাসনালয়ের প্রয়োজনও ছিল না আর চলমান যাযাবর জীবনে কোনো উপাসনালয়ের উপস্থিতিও সম্ভব ছিল না। আমাদের উপাসনা ছিল সরাসরি, কোনো স্থান, কাল, পাত্র ও মাধ্যমের কোনো প্রয়োজন আমাদের কখনোই ছিল না। আমাদের উপাসনা একজন ব্যক্তির সঙ্গে প্রকৃতির সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে পালিত হতো। উপাসনার মাঝখানে কোন ওঝা বা পুরোহিতের উপস্থিতি চেঙ্গিস খান সব সময় এড়িয়ে চলতেন। চেঙ্গিস খান বিশ্বাস করতেন, মানুষের আত্মা সরাসরি স্বর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত আর তার এই আত্মাই হচ্ছে তার নিজ মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বলতেন, স্বর্গ আসলে অন্য কিছু নয়, আমাদের চারপাশের সকল আত্মার প্রতি সচেতনতাই গঠন করে স্বর্গ। স্বর্গ হচ্ছে মঙ্গোলদের পথপ্রদর্শক, স্বর্গ হচ্ছে আকাশ; যার নিচে আমাদের সবার জন্ম হয়েছে মুক্তভাবে ও সমতার সঙ্গে বিচরণ করার জন্য।

বৌদ্ধ ধর্মের নির্বিকার বিশ্বদৃষ্টি আর কনফুসিয়াসের কঠিন সামাজিক অনুশাসন, এ দুটির কোনোটাই চেঙ্গিস খানকে কখনো প্রভাবিত করতে পারেনি। তিনি মনে করতেন, কনফুসিয়াসের অনুশাসন মহাবিশ্বের পরিসর থেকে মানুষকে কোনো একক রাজপরিবার বা কোনো রাষ্ট্রের মতো ক্ষুদ্র পরিসরে বন্দি করে ফেলবে। চেঙ্গিস খান ও মঙ্গোলরা যে মহাবিশ্বের ধারণায় বিশ্বাস করতেন, সেটা কোনো পরিবার বা স্থান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল না । চেঙ্গিস খান বা মঙ্গোলদের ঈশ্বর আর মঙ্গোলদের স্বর্গ যেহেতু আকাশ, তাই সে আকাশ তাদের সঙ্গে সঙ্গেই থাকতো সব সময়। অন্যান্য সভ্যতার মানুষদের মতো তারা নিজের স্বদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে গেলেও তাদের ঈশ্বর বা তাদের স্বর্গকে হারিয়ে ফেলার ভয় তাদের মধ্যে হানা দিতে পারেনি কোনো দিন। সে কারণেই মাত্র বিশ লাখ মঙ্গোল আর তার এক লাখ উনত্রিশ হাজার অশ্বারোহী বাহিনী পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো অবিচ্ছিন্ন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল, যা ভারতীয় বা চৈনিক সভ্যতা এতো প্রাচীন আর এতো শক্তিশালী সভ্যতা হওয়ার পরও করতে পারেনি। কেননা তাদের ঈশ্বর ও স্বর্গের ধারণা ছিল স্থান ও পাত্র নির্ভর। কালাপানি পার হলে ধর্ম নষ্ট হবে, এই ভয়ে ভারতীয়রা সমুদ্রপথে কোনো অভিযান করেনি (কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়, অন্তত দক্ষিণ ভারতীয়দের ক্ষেত্রে সত্য নয়। প্রায় দুই হাজার বছর আগে দক্ষিণ ভারতীয়রা জাভাসহ ইন্দোনেশিয়ার বিশাল অংশ তাদের অধীনে নিয়ে নেয়, আজও প্রায় ৮৫ শতাংশ মুসলিমদের দেশ ইন্দোনেশিয়ার বালিতে প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ হিন্দু ধর্মের অনুসারী ), এমনকি মঙ্গোলদের পরিভাষায় ‘দেশ’ বলে কোনো শব্দ ছিল না, সে কারণেই মঙ্গোলরা মনে করতো সারা পৃথিবী তথা সারা মহাবিশ্বই তাদের গের বা তাদের তাঁবু।

এতো গুরুগম্ভীর আলোচনার মাঝখানে আমি একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না,

অশ্বারোহীর সংখ্যা এক লাখ উনত্রিশ হাজার, এতো সঠিকভাবে কীভাবে বললে? এক লাখ ত্রিশ হাজার নয় কেন?

ও মনে হয় এমন প্রশ্নের সম্মুখীন আগেও হয়েছে, তাই কোনো প্রকার বিরক্তি প্রকাশ না করে বললো,

আমাদের সব প্রাচীন গ্রন্থেই হুবহু এই সংখ্যাটির কথা বলা আছে। তাই এ নিয়ে বেশি গবেষণা করার প্রয়োজন নেই।

আমার কথার উত্তর দিয়েই অনেকটা ঘোরগ্রস্তের মতো আবার লেকচার শুরু করলো,

মঙ্গোলরা মনে করে, আমরা শুধু লজিক আর বিধিমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবো কেন, আমাদের উচিত লজিককেও আমাদের বিশ্বাস দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা (খুব ঘোলাটে সাবজেক্ট বলে মনে হচ্ছে)। আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, আমার আপন সত্তাই এ মহাবিশ্বের কেন্দ্র, তুমিও তাই, সকল মানুষই তাই (আরো জটিল হয়ে গেলো)। মহাবিশ্বের কেন্দ্রে থেকেই আমাদের যার যার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। সে চ্যালেঞ্জে আমরা জিতবো না হারবো তা নির্ভর করবে প্রকৃতির ভারসাম্য আর আমাদের কর্মের সঠিক সময়ের সমীকরণের ওপর (খুবই জটিল)।
মঙ্গোলিয়া হলো পরিষ্কার নীল আকাশ আর বিস্তীর্ণ বৃক্ষহীন তৃণভূমির দেশ, আর দক্ষিণে রয়েছে বিশাল পাথুরে রুক্ষ মরুভূমি। বছরের বেশির ভাগ সময়ই সেটা ঠাণ্ড আর শুষ্ক; কিন্তু জুলাই আর আগস্টে এটা হলো পৃথিবীর স্বর্গ। এই স্বর্গের রূপের মধ্যেই প্রকাশিত হয়ে ওঠে আমাদের আধ্যাত্মিকতা। আধ্যাত্মিকতা আর ভূমিরূপ মঙ্গোলদের হৃহয় ও মস্তিষ্কে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কোনটা ভূমির সৌন্দর্য আর কোনটা আধ্যাত্মিকতা তা আমরা আলাদা করতে পারি না।

তোমাদের আলেকজান্ডার, জুলিয়াস সিজার বা নেপোলিয়নের চেয়ে চেঙ্গিস খান অনেক অনেক এগিয়ে (আমি মনে মনে বলছিলাম ‘আমাদের’ বলছ কেন? এঁরা কেউ আমাদের হিরো নন, কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম না ওর গল্প বলার ফোকাস নষ্ট হোক, তাই চুপ করে রইলাম), কারণ কি জানো?

আমি যথারীতি কোনো কথা না বলে আগ্র ভরে ওর উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।

কারণ হচ্ছে চেঙ্গিস খান ছিলেন অর্ধেক সভ্য আর অর্ধেক বর্বর। এই অর্ধেক বর্বর আর অর্ধেক সভ্য মানুষটিই আমাদের পিতা, আমাদের দেবতা, আমাদের সব কিছু। চেঙ্গিস খান বলতেন, যুদ্ধের বিবাদ যুদ্ধের মাঠেই মীমাংসা করো আর ঘরের বিবাদ ঘরেই মীমাংসা করো, সে বিবাদ মাঠে এনো না। যুদ্ধ শুরুর আগে চেঙ্গিস খান ছিলেন সভ্য মানুষ। মঙ্গোলরা কখনো ঘোষণা ছাড়া কোনো যুদ্ধ শুরু করতো না। তারা সারা রাত তাদের শত্রু শিবিরের কাছে ঘুমাতো, তারপর সকালে পরিপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে ও শত্রুপক্ষকে সতর্ক করার পর যুদ্ধ শুরু করতো। তবে যুদ্ধের সময় তারা ছিল চূড়ান্ত বর্বর আর চরম নিষ্ঠুর, সে সময় ভদ্রতা বা সভ্যতার কোনো নিয়মই তারা মানতো না। এই অর্ধেক সভ্য আর অর্ধেক বর্বর মানুষটিই আমাদের দিয়েছিল অনেক মৌখিক আইন, যে আইন তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতো। আমি সেখান থেকে মাত্র চারটি আইন এখানে উল্লেখ করছি, যার মাধ্যমে তখনকার মঙ্গোলদের সামাজিক ও নৈতিক মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা তুমি পাবে, আর যার ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান মঙ্গোলদের নৈতিকতার বোধ ও সামাজিক আচরণগুলো গড়ে উঠেছে। সেগুলো হচ্ছে.
১. যদি কোনো মানুষ অন্য কোনো মানুষের সামনে খাবার খাওয়ার সময় তাকে খাবারের জন্য আমন্ত্রণ না করে, তবে তাকে কঠিন শাস্তি দিতে হবে।
২. যদি কোনো মানুষ কিছু চুরি করে, তবে তাকে ওই চুরি করা বস্তুর ৯ গুণ পরিমাণ (দশ গুণ নয় কেন, কে জানে) অর্থ প্রদান করতে হবে।
৩. যদি কেউ কোনো ঘোড়ার চোখে আঘাত করে তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
৪. যদি কেউ সমকামিতা করে তবে তাকে মৃত্যদণ্ড দেওয়া হবে।

আমি তোমাকে আমাদের ভূখণ্ড নিয়ে একটি প্রাচীন মঙ্গোলীয় কবিতার কয়েকটা লাইন শোনাই, কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদও আমি তোমাকে WhatsApp করে দেবো :

আকাশের নীল নক্ষত্ররা তোমার দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে,
ঘাসফড়িংয়ের নিরন্তর ডাক তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
সময় হয়ে এলে সাহসী খানদের দেশে প্রহরীরা ঘুমুতে যায়,
আর তখন,
তোমার চোখে জ্বলজ্বল করে ওঠে মরুর মরীচিকা,
তুমি যখন তোমার বয়স ভুলে যাও,
উটের দেশের বিশাল ভূখণ্ড তখন,
কেমন যেন হঠাৎ নড়েচড়ে ওঠে।

এ পর্যন্ত বলেই চিনুয়া হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা শুরু করলো। দেখলাম ভুলে সে তার সাধের সিগারেটের প্যাকেট টেবিলের কোনায় ফেলে রেখে গেছে। আমরা কিছু বুঝে ওঠবর আগেই হোটেলের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি অনেকটা টালমাটাল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে চিনুয়া একা নিমেষে বাইরের হিমশীতল অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

মাহফুজুল হক জগলুল
২৪ নভেম্বর, ২০২২

আরও পড়ুন