মঙ্গোলিয়া, সাহসী মানুষের দেশে : নবম পর্ব

আমি যখন মিনি নাদাম থেকে ফিরে স্থপতি কাজি আরিফ আর স্থপতি লাভলুদের বেস্ট ওয়েস্টার্ন তুশিন হোটেলের সাত তলার বিখ্যাত আড্ডাশ্রম থেকে ব্লাড প্রেসারের ট্যাবলেট খাওয়ার অজুহাতসহ আরো কিছু ভুজুংভাজুং বলে ওদের জম্পেশ আড্ডা থেকে সাময়িক বিরতির অনুমতি নিয়ে এবং আধাঘণ্টার মধ্যে ফেরার কসম খেয়ে পুমা হটেলে এসে ঢুকেছি, রাত তখন আনুমানিক বারোটা-সাড়ে বারোটা হবে।

পুমা হোটেলের মাঝারি আকারের লবিতে ঢুকেই দেখি সব লাইট বন্ধ করে শুধু একটি লাইট জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। দারোয়ান ব্যাটা লবির লম্বা কালো থ্রি সিটেড বিশাল লেদার সোফায় শুয়ে আছে, অন্ধকারে শুধু তার মুখমণ্ডলটা দেখা যাচ্ছে। কেননা সে যে মোবাইল নিয়ে খেলছে তার আলো এসে তার মুখের ওপর পড়ে অন্ধকারে শুধু তার মুখমণ্ডলটা ঝলমল করছে। তার ভোমা সাইজের দুটো বুট সে খুলে রেখেছে সোফার পাশেই, অর্থাৎ ডিউটি ফাঁকি দিয়ে রাতে ঘুমানোর জোরদার পূর্বপ্রস্তুতি চলছে। আমাকে দেখে তাকে অনেকটা বাধ্য হয়ে উঠে বসতে হলো। তার সারা চোখে-মুখে প্রচণ্ড বিরক্তি। আমার মতো রাতজাগা কাস্টমার বোধ হয় সচরাচর এ হোটেলে ওঠে না। তাই তার প্রতি রাতের ঘুমে কেউ বিঘ্ন ঘটায় না। আমি যেহেতু সাত-আট দিন এ হোটেলে থাকবো, তাই চিন্তা করে দেখলাম এ ব্যাটার সঙ্গে আগে থেকেই কিছুটা খাতির আর সমঝোতা করে নেওয়া ভালো। আমি তাকে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলাম,

তোমার নাম কী?

ও বিরক্তভাবে বললো,

বাতু।

আমি বিদেশে গেলে সব সময় যা করি এবারও তা করলাম, জিজ্ঞেস করলাম বাতু নামের অর্থ কী?

এবার দেখলাম, তার মুখমণ্ডল থেকে বিরক্তি ভাব সরে গেছে। সে দুপুরের মতো মিটিমিটি হেসে খুব উৎসাহ নিয়ে উত্তর দিলো,

বাতু মানে হচ্ছে অনুগত আর দৃঢ়।

আমি বললাম,

একজন গার্ডের জন্য এর চেয়ে আর যথাযথ নাম আর কী-ই বা হতে পারে। তোমার নামটা তোমার চাকরির জন্য পারফেক্ট।

আমার প্রশংসায় কাজ হলো, দেখলাম, তার মুখের মিটিমিটি হাসি এখন বিস্তৃত হাসিতে পরিণত হচ্ছে। এরপর যে কদিন এ হোটেলে ছিলাম আমার জন্য ওর মুখে আর কখনো বিরক্ত ভাব দেখিনি।
অন্যদিকে প্রায় অন্ধকার সেই লবির রিসিপশন কাউন্টারের দিকে তাকিয়ে দেখি জীবনে প্রথম চাকরিতে যোগ দেওয়া সেই বুর্জিগিন রাতজাগা টকটকে লাল দুটি চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার চুল সব এলোমেলো আর সব মিলিয়ে তার চেহারায় কেমন যেন একটা বিধ্বস্ত ভাব। জীবনের প্রথম চাকরির দিনের প্রেসারে সে মনে হয় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। আমাকে দেখেই সে বললো, আমার জন্যই সে রাত জেগে অপেক্ষা করছে। আমি মনে মনে বললাম, আমার জন্য কেন অপেক্ষা করছো? তোমার তো বাবা এমনিতেই সারা রাত জেগে ডিউটি দেওয়ার কথা, তবে মুখে কিছু বললাম না। সে কয়েকটা কাগজ আমার দিকে এগিয়ে দিলো স্বাক্ষর করার জন্য। আমি কোনো কিছু না দেখেই তা স্বাক্ষর করে দিলাম। ক্রেডিট কার্ড চাইলো, তাও দিলাম। ক্রেডিড কার্ড নিয়ে আবার সকালের মতো কার্ড টার্মিনালে (POS) গুঁতাগুঁতি করতে লাগলো, গুঁতাগুঁতিতে সাহায্য করার জন্য খালি পায়ে এসে যুক্ত হয়েছে সেই দারোয়ান বাতু। বেচারার জন্য আমার খুব মায়া লাগছিল তখন। কাজ করার ফাঁকে সে আমাকে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বসলো, ওর মতো বিধ্বস্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের কাছ থেকে এমন একটা আক্রমণাত্মক প্রশ্নের জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। ও আমার পাসপোর্টের ফটোকপি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

তোমার নাম এতো লম্বা কেন? তোমার নামে খান এলো কোত্থেকে? তোমাদের দেশেও খান আছে?

এতোগুলা প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে দিতে গিয়ে আমি কিছুটা দম নিয়ে নিলাম। বুঝতে পারলাম, আমি ওকে যেমন দুর্বল ব্যক্তিত্বের মানুষ ভেবেছিলাম, আসলে সেটা মোটেও সঠিক নয়। মনে হলো যেন খেলা ঘুরে গেছে, দুপুরবেলা হোটেলে ঢুকেই আমি অফেনসে খেলছিলাম আর ও খেলছিল সম্পূর্ণ ডিফেনসে; কিন্তু এখন আশ্চর্যজনকভাবে রাতের বেলা ও প্রথম দেখাতেই অফেনসিভ খেলা শুরু করে দিয়েছে। তবে ওর প্রশ্নটা ইন্টারেস্টিং আর আমার হাতে তখন অনেক সময়। তাই মাথা ঠাণ্ডা করে কিছুটা লেকচার দেওয়ার ভঙ্গিতে উত্তর দিতে শুরু করলাম। আমি বললাম,

আমাদের বাঙালি মুসলমানরা ঐতিহাসিকভাবেই নিজেদের নাম রাখে ইসলাম ধর্মকে অনুসরণ করে আরবি ভাষায়। আরবদের নাম আরো অনেক দীর্ঘ হয়ে থাকে। সে তুলনায় আমার নাম আরবিতে হলেও ওদের তুলনায় অনেক ছোট। আর তোমাদের চেঙ্গিস খান সর্বপ্রথম ১২১৯ সালে মধ্য এশিয়ার মুসলিম শাসিত অঞ্চল খোয়ারিজমি সাম্রাজ্য এবং পরে সমরখন্দ, বোখারা, প্রাচীন খোরাসান অঞ্চল, সমগ্র আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও কাশ্মীরের বেশ কিছু অংশ দখল করে নেয়। তারপর চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খান ১২৫৮ সালে নিষ্ঠুর আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে মুসলিম সভ্যতার তৎকালীন কেন্দ্রভূমি বাগদাদ তাদের অধীনে নিয়ে আসে। তবে চেঙ্গিস খানের জ্যেষ্ঠ ছেলের সন্তান অর্থাৎ চেঙ্গিস খানের নাতি বার্কে খান সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং মধ্য এশিয়া থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিম সীমানা পর্যন্ত মঙ্গোল অধিপতিরা প্রায় সবাই আস্তে আস্তে মুসলিম হয়ে যায়। সেখান থেকে ভারতে প্রায় আটশ বছরের মুসলিম শাসনের সময় মঙ্গোলীয়দের এই খান উপাধি আস্তে আস্তে মধ্য এশিয়া হয়ে উত্তর ভারতের ভেতর দিয়ে সারা ভারতের মুসলিম সমাজে ছড়িয়ে পড়ে আর এভাবেই কালক্রমে আমার পূর্বপুরুষদের মাধ্যমে খান নামটি আমাদের পরিবারের পদবি হয়ে যায়।
এতো দূর বলেই আমি আমার উত্তর শেষ করলাম, তবে এখন এখানে অতিরিক্ত যা লিখছি তা লিখছি একই প্রসঙ্গে এ লেখা যাঁরা পড়বেন সেই পাঠকদের উদ্দেশে।

মঙ্গোলদের কাছে খান বা মহান খান ( Khagan or Great Khan) অর্থ হচ্ছে সম্রাট, তবে পরবর্তী সময়ে মধ্য এশিয়া বা আফগানিস্তান ও ভারতীয় উপমহাদেশে এসে খান বলতে আর সম্রাট বোঝাতো না, বরং এর গুরুত্ব ও সম্মান অনেক কমে যায়। সুলতানি আমলে ও বিশেষ করে মুঘল আমলে খান খেতাবটি প্রধানত সেনাপতি ও রাজানুকূল্য পাওয়া আমলা বা অভিজাত সমাজপতিদের আনুগত্যের জন্য রাজ পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হতো এবং পরবর্তী সময়ে বংশানুক্রমে এটি তাদের পারিবারিক পদবি হয়ে যেতো। খান উপাধি বা খেতাবটি প্রায়শই একটি গুণবাচক নামের পরের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যেমন—খানখানন (প্রভুদের নেতা), খান আজম (মহান নেতা), খান জাহান (পৃথিবীর নেতা), খান জামান (মহান নেতা)  ইত্যাদি। মুঘল দরবারের সমর নেতাদেরই প্রধানত এসব খেতাব দেওয়া হতো আর সে জন্য এসব খেতাবের সঙ্গে বীরত্ব, সাহসিকতা বা যুদ্ধে শৌর্য-বীর্য প্রদর্শনের ব্যাপারগুলোর সরাসরি সম্পর্ক ছিল। খেতাবগুলো একটু খেয়াল করলেই সেটা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে, যেমন—লস্কর খান (সেনা নেতা), হিম্মত খান (সাহসী নেতা), সাইফ খান (উত্তম তলোয়ার চালনাকারী নেতা), শাহবাজ খান (সাহসী নেতা), বাহাদুর খান (দুঃসাহসী নেতা), গাজী খান (ধর্মযুদ্ধে বিজয়ী নেতা)। তবে শুধু সমর নেতাদের হাতে রাখলেই তো রাজ্য শাসন করা যায় না, রাজ্য শাসন করতে বেসামরিক আমলা, বুদ্ধিজীবী আর অভিজাত সমাজপতিদেরও (civil society) হাতে রাখতে হয়, তাই কিছু অনুগত আমলা বা বুদ্ধিজীবী যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতো না, তাদের দেওয়া হতো ইখলাস খান (খাঁটি নেতা), ইতিমাদ খান (বিশ্বস্ত নেতা), দিনদার খান (ধার্মিক নেতা)  ইত্যাদি খেতাব। তবে সুলতানি ও মুঘল আমলে অনেক আমলা বা রাজানুগ্রহ পাওয়া অনেক ব্যক্তি, যারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিল তাদের অনেকেও খান উপাধি পায় ও পরবর্তী সময়ে এটি তাদের পারিবারিক পদবি হয়ে যায়। এই হিন্দু খানদের মধ্যে অনেক ব্রাহ্মণও ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে এখনো এমন কিছু হিন্দু খান পরিবার আছে। এ ছাড়া হিন্দু ব্রাহ্মণদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করে তাদের অনেকেই মুসলিম হয়ে সরাসরি খান পদবি নিয়ে নেয়। আর অন্যদিকে মুসলিমদের মধ্যে যারা আফগান ও পাঠানদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়, তারাও অনেকে খান পদবি ধারণ করে। ব্রিটিশ আমলে এ খেতাবগুলো বদলে হয়ে যায় ‘খান সাহেব’ ও ‘খান বাহাদুর’ আর হিন্দুদের জন্য হয় ‘রায় সাহেব’ ও ‘রায় বাহাদুর’।

আমার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো বুর্জিগিন। দুপুরবেলা তাকে দেখে যেমন এলেবেলে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মনে হচ্ছিল তখন তাকে আর তেমন মনে হচ্ছিল না। তখন তাকে মনে হচ্ছিল তরুণ শাণিত বুদ্ধিজীবীর মতো কেউ একজন। মনে হলো, আমার সঙ্গে সে বিতর্ক করতে চাচ্ছে। আমিও চাচ্ছিলাম একজন মঙ্গোলীয়কে ভেতর থেকে দেখতে। একটি দেশে গেলে ভূপ্রকৃতি আর শহর-নগর দেখার চেয়ে সে দেশের মানুষকে কাছে থেকে দেখা আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই সে যখন বললো, চলো, আমাদের অফিস রুমে গিয়ে বসি। আমি রাজি হয়ে গেলাম। আমরা দুজন রিসিপশন ডেস্কের পাশেই খালি অফিস রুমে গিয়ে আরাম করে বসলাম। বসেই ও বেশ শান্ত হয়ে এলো আর অনেকটা আত্মপক্ষ সমর্থনের ভঙ্গিতে বলা শুরু করলো, ওর দাদা ছিল মঙ্গোলিয়ার পূর্বাঞ্চলের যাযাবর গোত্র নেতা। যাযাবর হিসেবে সে খুবই বিত্তবান ছিল। তার হাজার হাজার পশু ছিল। যাযাবর হিসেবেই সে মারা যায়। তার বাবারা তিন ভাই। এই তিন ভাইয়ের মধ্যে দুজন যাযাবর জীবন ছেড়ে এসে শহরে বসবাস শুরু করেছে। ওর এক চাচা এখনো যাযাবর হিসেবে জীবন যাপন করে এবং এখনো বিপুলসংখ্যক পশুর মালিক। ওর চাচা ও চাচাতো ভাই-বোনেরা মাঝে মাঝে শহরে ওদের কাছে বেড়াতে আসে আর ওরাও কখনো কখনো ওদের তাঁবুতে যায়। বিশেষ করে নাদামের সময় পরিবারের সবাই যাযাবর চাচার গেরে কাটিয়ে আসে কয়েকদিন। ওর বাবা ও শহুরে চাচা মিলে তাদের যাযাবর বাবার কাছ থেকে যে ধনসম্পদ পেয়েছে তা দিয়ে উলানবাটোরে বড় ধরনের হার্ডওয়্যারের ব্যবসা শুরু করে। ওদের পরিবারের যে আর্থিক অবস্থা তাতে তাকে এ হোটেলের রিসিপশনে কাজ করার কোনো দরকার পড়ে না। তবু সে কয়েক বছর হোটেলে কাজ করতে চায় শুধু বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আশায়। এটাই তার জীবনের নেশা। তার ইচ্ছা চার-পাঁচ বছর এভাবে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে নিজে একটা ট্রাভেল ও ট্যুর কোম্পানি দেওয়া। এ কারণেই সে আমার সঙ্গে এতো কথা বলছে এবং যেকোনো কাকতালীয় কারণেই হোক আমিই তার প্রথম এক্সপেরিমেন্টাল স্পেসিমেন্ট হয়ে আজ মধ্যরাতে তার সামনে বসে আছি। আমিও খুশি হয়ে মনে মনে বললাম, আমিও তোমার মতো এমন কাউকে খুঁজছিলাম।
এবার বুর্জিগিন নতুন একটা প্রশ্ন করলো, বললো,

মেনে নিলাম তোমরা তোমাদের ধর্ম থেকে তোমাদের নাম রাখো, তাই বলে তোমরা নিজের ভাষা বাদ দিয়ে অন্যের ভাষায় নিজেদের নাম রাখো?

এমন বড়ো মাপের একটা সাংস্কৃতিক প্রশ্ন ও আমাকে করতে পারবে আমি ভাবতে পারিনি। তবে এ প্রশ্নটি আমার কাছে নতুন না, তাই এর উত্তর আমার মোটামুটি প্রস্তুতই ছিল। বিদেশে নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বললে অন্যকে যেমন চেনা যায়, আবার নিজেকেও নতুনভাবে চেনা যায়। বন্ধুবর স্থপতি নির্ঝর কিছুদিন আগে কথায় কথায় আমাকে বলেছিল, অচেনাকে চেনার চেয়ে চেনাকে চেনা অনেক কঠিন। আমার কাছে মনে হয়েছে কথাটা খুব মূল্যবান।

ওকে আমি যে উত্তরটা দিয়েছিলাম সেটা এখানে গুছিয়ে লিখছি। আমি ওকে বললাম, পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষই জেনে বা না জেনে তাদের বা তাদের পূর্বপুরুষদের অনুসৃত ধর্ম বা পৌরাণিক চরিত্র অনুসরণ করে তাদের নাম রাখে, এখানে ভাষার চেয়ে সেই ধর্ম বা সেই পৌরাণিক চরিত্র যে ভাষায় সেটা মুখ্য। যেমন ধরা যাক পিটার, জন, ডেভিড, মাইকেল, জোসেফ, জ্যাকব, বেঞ্জামিন, আব্রাহাম এগুলো কোনো ইংরেজি বা রোমান শব্দ না, তবু ইংরেজিভাষী উত্তর আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, ইতালিসহ সমগ্র ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার তাবৎ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী দেশের মানুষের নাম হাজার হাজার মাইল দূরের সেই প্রাচীন প্যালেস্টাইনের এসব হিব্রু বা অ্যারাবিক শব্দ দিয়ে গঠিত। কেননা এ নামগুলো তাদের ধর্মগ্রন্থের সম্মানিত চরিত্র। এ নামগুলো রাখার সময় বা এগুলো উচ্চারণ করার সময় তারা একবারের জন্যও এই জটিল চিন্তা করে না যে এগুলো তাদের ভাষার শব্দ কি না। এমনকি অনেক বিখ্যাত নাস্তিক মানুষের নামও এমন সব ধর্মীয় চরিত্র অনুসরণ করে রাখা। যেমন ধরা যাক গত শতাব্দীর অন্যতম প্রধান দার্শনিক, অস্তিত্ববাদের জনক ফরাসি নাগরিক জ্যাঁ পল সাত্রের কথা। তিনি ছিলেন কঠোর নাস্তিক, কিন্তু তাঁর নামে পল শব্দটি এসেছে খ্রিস্ট ধর্মের অন্যতম প্রধান প্রচারক জেরুজালেমের সেই সেন্ট পলের নাম থেকে। অথবা ধরা যাক রাশিয়ায় জন্ম নেওয়া আমেরিকান বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লেখক আইজ্যাক অসিমভের কথা। তিনি ছিলেন কঠোর ধর্মবিরোধী মানুষ; কিন্তু তাঁর নামের আইজ্যাক (ইসহাক) শব্দটি এসেছে একটি ধর্মীয় চরিত্র হিসেবে, তিনি হচ্ছেন হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পুত্র, যিনি ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম—এ তিন ধর্মেই নবী হিসেবে পরম সম্মানিত।

অন্যদিকে যদি ভারতবর্ষের দিকে তাকাই, সেখানেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের নাম এসেছে মহাভারত, রামায়ণ বা বেদের বিভিন্ন দেবতাদের নাম বা অন্যান্য পৌরাণিক চরিত্র থেকে। এদের মধ্যে বিরাট একটা অংশের পুরুষেরই নাম ত্রি-দেবের এক দেব শিব ও অন্য দেব বিষ্ণুর নাম অনুসরণে। ব্রহ্মার নামে নামের সংখ্যা খুবই কম।
শিবের অনেক নাম, তবে যে নামগুলোই সারা ভারববর্ষে পুরুষের নাম হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয় তার কিছু উদাহরণ এখানে দিচ্ছি—শিব, শংকর, মহেশ্বর, হর, সিদ্ধেশ্বর, নাগেন্দ্র, দেবেশ্বর, মৃত্যুঞ্জয়, গিরিশ, বিক্রম, শম্ভু, পিনাকী, শশীশেখর, নীললোহিত, অম্বিকানাথ, শ্রীকণ্ঠ, গঙ্গাধর, বিশ্বেশ্বর, চন্দ্রশেখর। অন্যদিকে বিষ্ণুর নামের অনুসরণে যে নামগুলো সারা ভারতে খুব জনপ্রিয় সেগুলোর কিছু এখানে তুলে ধরছি, যেমন—হরি, রাম, বলরাম, কৃষ্ণ, জনার্দ্দন, চক্রধর, নারায়ণ, শ্রীধর, গোবিন্দ, মধুসূদন , রঘুনন্দন, মাধব, রমণীমোহন ইত্যাদি। এখানে নামটি কোন ভাষার শব্দ সেটার চেয়ে নামটা কোন ধর্মীয় বা পৌরাণিক চরিত্রের বিখ্যাত যুক্ত সেটা তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মাহফুজুল হক জগলুল
২২,অক্টোবর, ২০২২

আরও পড়ুন