সেদিনের মিনি নাদামে প্রকৃত নাদামের মতো কোস্তাকুস্তি ছাড়াও বাকি দুটো খেলারও প্রদর্শনী অর্থাৎ ঘোড়ার খেলা আর তীরন্দাজীরও ব্যবস্থা ছিল। আগেই বলেছি, মঙ্গোলীয় ঐতিহ্যবাহী জোব্বা, যাকে ওরা বলে দেল সেই লাল-নীল দেল পরে অনেক অভিজ্ঞ গাট্টাগোট্টা তীরন্দাজ বসে ছিল আমাদেরকে তীর ছোড়ায় সাহায্য করার জন্য। দেখতে যতোই গাট্টাগোট্টা হোক তাদের ব্যবহার ছিল খুবই অমায়িক।
তীর ছোড়ার জন্য বাহুর পেশিতে যে শক্তি দরকার তা আমার মতো ভেতো বাঙালসহ আমন্ত্রিত স্থপতিদের অনেকেরই ছিল না। তবে কম বয়সী কয়েকজন স্থপতিকে দেখেছি তিড়িং তিড়িং করে তীর ছুড়ে মারছে, তবে সেগুলো কোন দিকে যাচ্ছে তার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এই সব অতিমাত্রায় উদ্দীপ্ত নবিশ তীরন্দাজের কাছাকাছি থাকাটা ছিল খুব বিপজ্জনক। কেন বিপজ্জনক তা একটা গল্প দিয়ে বুঝিয়ে বলছি। নোয়াখালী অঞ্চলে নাকি খুব বিখ্যাত কিন্তু খেপাটে এক ফুটবল খেলোয়াড় ছিল, যার নাম ছিল মজিদ। এই মজিদের পায়ে খুব জোর ছিল আর তার পায়ে বল গেলেই রেফারি জোরে আওয়াজ দিতো,
মজিদ্দার পায়ে বল দুই গলিই সাবধান।
এর অর্থ হচ্ছে, খ্যাপাটে মজিদ পক্ষ-বিপক্ষ বোঝে না, সে কারণে যেকোনো পোস্টেই সে আচমকা গোল করে বসতে পারে, তাই দুই গোলকিপারই যেন সাবধানে থাকে। এই মঙ্গোলিয়ান বিশাল প্রান্তরে বসেও আমাদের ওই নব্য তীরন্দাজদের তীর ছোড়া দেখে সেই নোয়াখালীর মজিদ্দার গল্প মনে পড়ে গেলো, এরা কোন দিকে তাক করবে তাদের তীর আর কোন দিকে সেটা ছুটে যাবে তা বলা শক্ত, শেষমেশ নাদাম দেখতে এসে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গানের আর্তনাদের সতীর্থ হতে চাচ্ছিলাম না,
তীর বেঁধা পাখি আর গাইবে না গান,
ভুলে গেছে জীবনের হাসি-কলতান।
তবে আমি তীর না ছুড়লেও ধনুক আর তীর খুব মনোযোগ দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখেছি অনেকক্ষণ ধরে আর মিনি নাদামে উপস্থিত রঙিন দেল সজ্জিত অভিজ্ঞ তীরন্দাজ ওস্তাদদের কাছ থেকে ভলান্টিয়ার দোভাষীর মাধ্যমে ধনুর্বিদ্যার ওপর কিছু টাটকা জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছি। আমার মতো সরাসরি তীর ছোড়ায় নিরুৎসাহী কিন্তু ধনুর্বিদ্যায় জ্ঞানার্জনে চরম উৎসাহী এমন বিটকেল মাল তারা আগে মনে হয় কোনো দিন দেখেনি। তাই প্রথমে তারা একটু ইতস্তত করলেও কিছুক্ষণ পরই প্রবল উৎসাহে একাধিক ওস্তাদ আমাকে জ্ঞানদানে তৎপর হয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে পুঁথি পাঠের আগে যেমন শুরুতেই বলে,
প্রথমে বন্দনা করি হায় গো প্রভু নিরঞ্জন
যাহার কৃপাতে পয়দা হইলো ত্রি ভুবন।
তার পরে বন্দনা করি হায় গো রাছুলের চরণ।
পশ্চিমে বন্দনা করি হায় গো মক্কা আর মদিনা
উত্তরে বন্দনা করি হায় গো হিমালয় পর্বত,
পূর্বেতে বন্দনা করি হায় গো বানুসর,
দক্ষিণে বন্দনা করি হায় গো ক্ষীর নদীর সাগর সেই স্থানে চালায় ডিংগা যত সাধু সদাগররে আল্লা সাধু সদাগর।
( এ বন্দনার ছোট-বড়ো অনেক ভার্সন আছে)
মঙ্গোলিয়ায় যেকোনো ঐতিহ্য সম্পর্কিত বিদ্যা অর্জনের চেষ্টা করতে গেলে আমাদের মতো এতো নানামুখী বন্দনার কোনো অবকাশ নেই। তাদের সব বন্দনাই একমুখী, শুধু একজনকে ঘিরেই। তিনি আর কেউ নন, তিনি তাদের নেতা, তাদের আজীবনের সম্রাট, তাদের দেবতা চেঙ্গিস খান। যেকোনো বিষয়ে আলাপ শুরু আগে-পরে বা মাঝখানে ঘুরেফিরে সেই চেঙ্গিস খানের নাম আসবেই আসবে। এখানেও তীরন্দাজ ওস্তাদজিরা এদের বক্তব্যের প্রথমেই যে কথাটা বললো সেটা হলো চেঙ্গিস খান ও তার সেনাপতিরা যে জিনিসটার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতেন সেটা হচ্ছে তাদের সেনাবাহিনী প্রচণ্ড বেগে ঘোড়া চালানো অবস্থায় বিদ্যুৎগতিতে একটার পর একটা তীর ছুড়ে লক্ষ্যভেদ করতে পারার দুর্দান্ত সক্ষমতা। মঙ্গোলদের যুদ্ধবিজয়ী হওয়ার পেছনে এটাই ছিল সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ কৌশল। মঙ্গোলদের মতো ঘোড়ার পিঠে প্রচণ্ড বেগে ধাবমান অবস্থায় এতো নিখুঁতভাবে অন্য কোনো সেনাবাহিনী অভীষ্ট লক্ষ্যভেদ করতে পারতো না।
মঙ্গোলরা যে ধনুক ব্যবহার করে তা হলো কম্পোজিট দুবার বাঁক নেওয়া প্রতিসম ধনুক। মঙ্গোলীয় বিস্তৃত তৃণভূমি মাইলের পর মাইলে বৃক্ষহীন, তাই কাঠের অভাবের কারণে ওদের ধনুকের উপকরণ ও ডিজাইন পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মতো না হয়ে বিকল্প পথ ধরে বিকশিত হয়েছে। এ কারণে মঙ্গোলীয় ধনুকে অনেক কম পরিমাণ কাঠ ব্যবহৃত হয়। তবে এ ধনুককে অতিরিক্ত শক্তিশালী করে তোলে ধনুকের হাতলে ইয়াঙ্গির নামের এক ধরনের বন্য ছাগলের শিংকে সংযুক্ত করার মাধ্যমে। কাঠ আর শিংসহ সব উপাদান একত্রে খুব জোরালোভাবে সংযুক্ত করতে ব্যবহার করা হয় ষাঁড়ের পেশি দিয়ে তৈরি এক বিশেষ ধরনের তন্তু আর জৈব আঠা। তবে এ সব কিছুর পরও মঙ্গোলীয় ধনুকের প্রধান শক্তি নিহিত রয়েছে এর অসাধারণ কাঠামোগত জ্যামিতিক নকশার মধ্যে।
অন্যদিকে মঙ্গোলীয় তীরে ব্যবহৃত হয় বার্চ কাঠ। সাধারণত একেকটা তীর প্রায় চল্লিশ ইঞ্চির মতো লম্বা হয়। তীরের লেজে সাধারণত সারস পাখির পালক ব্যবহার ওরা পছন্দ করে, তবে তা না পাওয়া গেলে অন্যান্য পাখির পালকও ব্যবহৃত হয়।
আমাদের জন্য আয়োজিত মিনি নাদামে ঘোড়াও ছিল অনেকগুলো। সে ঘোড়াগুলোর জকিরা ছিল সব এগারো-বারো বছরের কিশোর। কিশোর জকি শুনলেই আমাদের মধ্যে একধরনের নেগেটিভ ধারণা জন্ম নেয়, কেননা আরব দেশগুলোতে বাচ্চা বাচ্চা দরিদ্র দেশের শিশুদের উটের দৌড়ের জকি বানানো হয়, এ খবর আমরা বহু দিন ধরে শুনে আসছি। এদের মধ্যে অনেক শিশু জকি শারীরিকভাবে এমন আঘাতপ্রাপ্ত হয়, অনেকে মারাও গেছে এভাবে। এদের মধ্যে অনেকেই ছিল আমাদের বাংলাদেশের হতভাগ্য দরিদ্র পরিবারের শিশু। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের চুরি করে মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করা হতো উটের জকি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। বিশ্বব্যাপী এর বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন হয়েছে, অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। যদিও উটের ওপর জোর করে বসিয়ে দেওয়া এসব শিশুকে জকি বলা হয়, আসলে এরা জকি না। উট তার পিঠের ওপর জীবন্ত কিছু না বসালে দৌড়ায় না, তাই এসব শিশুকে জোর করে এনে বসিয়ে দেওয়া হতো। আরবরা তাদের নিজেদের শিশুদের সেখানে বসাতো না, বসাতো বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সুদান, ইথিওপিয়াসহ গরিব দেশের শিশুদের। তবে মঙ্গোলিয়ায় ঘোড়ার ওপর যেসব কিশোর ছিল তারা সবাই ছিল সত্যিকারের জকি। তারা নিজের ইচ্ছায়, নিজের খুশিতে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বেড়ায়, ঘোড়দৌড়ে অংশগ্রহণ করে। এটা তাদের কাছে প্রধান ক্রীড়া। আমাদের দেশের ছেলেরা যেমন ফুটবল বা ক্রিকেট খেলে, ওদের কাছে ঘোড়া চালনা বা ঘোড়দৌড় তেমনই আনন্দদায়ক খেলা। আসলে এটা ওদের কাছে খেলার চেয়েও অনেক বেশি কিছু, ঘোড়া চালনা বা ঘোড়দৌড়ে অংশগ্রহণ করা ওদের একদম নিবিড় ঐতিহ্যের অংশ। যে ছেলে বা কিশোর ঘোড়া চালাতে পারে না তারা ওদের কাছে হাসির পাত্র।
কুস্তি, তীরন্দাজী আর ঘোড়া নিয়ে জকিদের ঘুরে বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে কিছুক্ষণ পরপরই চারদিকে তাঁবুঘেরা বিশাল মাঠের মধ্যে চলছিল মঙ্গোলীয় ঐতিহ্যবাহী রংবেরঙের দেল পরিহিত নারী-পুরুষের সম্মিলিত বিয়েগলি নাচ। ওদের নাচের মুদ্রায় আমাদের উপমহাদেশের প্রাচীন শাস্ত্রীয় নৃত্যরীতির মতো অতটা নিখুঁত শান্ত সৌকর্য ও নিগূঢ় পরিশীলিত ব্যঞ্জনা হয়তো ছিল না, কিন্তু নৃত্যরত সব নারী-পুরুষের মুখমণ্ডলে ছিল স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তৃত হাসি আর অকৃত্রিম যূথবদ্ধ ছন্দোময় আনন্দের প্রতিফলন। নাচটা যে এরা সবাই তাদের অস্তিত্বের গভীরতম জায়গা থেকে পরমভাবে উপভোগ করে, সেটা তাদের আনন্দমুখর অভিব্যক্তি আর দেহভঙ্গিমা দেখেই বোঝা যায়। আর তাদের এই আনন্দমুখরতা দর্শকদের মাঝেও খুব দ্রুত আর সরাসরি প্রবাহিত ও সংক্রমিত হয় তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছি সেদিন। ওদের নাচের প্রাণবন্ত সম্মিলিত ছন্দ উপস্থিত দর্শকদের মনে ও দেহে প্রবাহিত করার আশ্চর্য ক্ষমতাই ঐতিহ্যবাহী মঙ্গোলীয় বিয়েগলি নাচের প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে আমার মনে হয়েছে। ওদের িই নাচ কেবল স্বাস্থ্যবান ও যূথবদ্ধ নির্মল আনন্দমুখর নারী-পুরুষের জন্য, দুর্বল ও আনন্দবিমুখ কারো জন্য এ নাচ নয়।
একসময় রাত গভীর হয়ে আসে। শীতের প্রকোপ আরো বাড়তে থাকে। তীব্র কনকনে মঙ্গোলীয় বাতাস একদম সূচের মতো হাড়ের মধ্যে ঢুকতে শুরু করে আর তখনই নাদামের অনুষ্ঠান শেষ হয় আর আমাদের নৈশভোজের ডাক পড়ে। চেঙ্গিস খান প্যালেস নামের বিশাল একটা গেরের দিকে আমরা হাঁটতে শুরু করি। এই বিশাল আর বিশেষ গেরটি আসলে ছিল একটা আধুনিক ব্যাংকুয়েট হল। বাইরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হলেও গেরের ভেতর তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিক। আসলে মঙ্গোলীয় গেরের যে গোলাকার বহির্দেয়াল থাকে তার ভেতরে তিন স্তরে পর্যাপ্ত ভেড়ার পশম দেওয়া থাকে। তাই বাইরের শীতলতা ভেতরে ঢুকতে পারে না আর ভেতরের উষ্ণতা বাইরে বের হতে পারে না।
গেরের ভেতরে নানা পদের মঙ্গোলীয় খাবারের বিস্তর আয়োজন ছিল। গানবাতার নামের এক মঙ্গোলীয় স্থপতির সঙ্গে কিছুটা খাতির হয়েছিল সেদিন। গানবাতার খুব আলাপী মানুষ আর ভোজের আগেই সে বোধ হয় অনেকক্ষণ ধরে বিশেষ তরল একটু বেশি খেয়ে ফেলেছিল। তাই আমি একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে সে চারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে চাচ্ছিল। মোট কথা, সে খুব বেশি বেশি কথা বলতে চাচ্ছিল। কিন্তু তার চাহিদা অনুযায়ী আমি তাকে যথেষ্ট প্রশ্ন সরবরাহ করতে পারছিলাম না। তবে একপর্যায়ে আমি সেই সুযোগটাই নিলাম। ওকে একে একে বুফে টেবিলে রাখা ঐতিহ্যবাহী মঙ্গোলীয় খাবার নিয়ে প্রশ্ন করে জেনে নিতে শুরু করলাম কোন খাবারের কী কী মাজেজা। মাঝারি পরিমাণ তরল পেটে গেলে সাধারণত মানুষ মিথ্যে কথা বলে না বলে আমার অভিজ্ঞতা। তাই গানবাতার যেভাবে টেবিলে সাজানো খাবারের বর্ণনা করেছে, আমি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে হুবহু ওর মতো করেই বর্ণনা করলাম এখানে।
প্রথমেই বলি খুসুউর নিয়ে। খাসির মাংসে কিমাপুরির আকারের মাখানো ময়দার তালের ভেতর রেখে আটকিয়ে দিয়ে অনেকটা আমাদের কুলি পিঠার মতো করে ডুবন্ত তেলে ভাজা হয়। কখনো কখনো খাসির মাংসের বদলে গরুর মাংসও বা অনেক দিনের শুকনো মাংসও খুসুউর বানাতে ব্যবহার করা হয়। তবে আমাদের সেদিনের খাবারে যে খুসুউর দেওয়া হয়েছিল, তাতে দেওয়া হয়েছিল বেশি চর্বিযুক্ত খাসির মাংস। মঙ্গোলীয়রা তাদের সবচেয়ে প্রিয় অতিথিদের সব সময় বেশি চর্বিযুক্ত মাংস খাওয়াতে পছন্দ করে। মঙ্গোলীয়দের কাছে যে খাবারে যতো বেশি চর্বি সে খাবার ততো বেশি সম্ভ্রান্ত হিসেবে গণ্য।

এর পরের উল্লেখযোগ্য ডিশটি ছিল গরুর মাংসের খোরখোগ। খোরখোগ আসলে গরম পাথর সহযোগে এক ধরনের বারবিকিউ। প্রথমে কিছু পাথর আগুনে খুব গরম করে একটা বালতি বা সাধারণত দুধ সংগ্রহের পাত্রে রাখা হয়। তার সঙ্গে রাখা হয় বড়ো বড়ো টুকরো করে কাটা গরুর মাংস। এরপর সামান্য মসলা মিশিয়ে বালতির মুখ আটকিয়ে এক থেকে দুই ঘণ্টা হালকা তাপে চুলায় রাখা হয়। বালতির মাংস অনেকটা গলে হাড় থেকে আলাদা হয়ে যায়। ভেতরের চর্বি গলে যায় এবং কিছুটা চর্বি আর মাংস থেকে বের হওয়া পানি পাথরগুলো শুষে নেয়। যেহেতু বালতির মুখ আটকানো থাকে, তাই মাংস আর মসলার সব সুগন্ধ বাইরে বের হতে পারে না। মঙ্গোলীয়রা যখন তাঁবুতে বসে খোরখোগ খায় তখন ওই পাথরের ওপর মাংস রেখে পরিবেশন করা হয়। ওরা আঙুল দিয়ে মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়, তবে ওই দিন আমাদের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা ছিল, আঙুল দিয়ে ছিঁড়ে খেতে হয়নি।
আরেকটি ডিশ ছিল, যার নাম চানাসান মাখ। এ পদটি ছিল অনেকটা সিদ্ধ করা ভেড়ার মাংস। বড়ো বড়ো লম্বা হাড়সহ ভেড়ার মাংস লবণ-পানিতে ডুবিয়ে আগুনে সিদ্ধ করা হয়। এ সময় পানিতে কিছু ভেষজও মিশিয়ে দেওয়া হয়। মাংস যখন নরম হয়ে যায় আর হাড় থেকে ছুটে আসতে শুরু করে তখন রান্না শেষ হয়। এটাই আসলে যাযাবর মঙ্গোলীয়দের সবচেয়ে বহুল জনপ্রিয় পদ। কেননা তাদের যাযাবর জীবনে মাংস ছাড়া রান্নার বিকল্প পদের জোগাড়ের সম্ভাবনা যেমন কম আর তাদের সময়ও কম, তাই এ পদটাই সবচেয়ে সহজে অনেক মানুষের জন্য একবারেই রান্না করা যায়। তাই ওদের যাযাবর জীবনের সঙ্গে সবচেয়ে সংগতিপূর্ণ রান্নার পদ হচ্ছে এই চানাসান মাখ। চেঙ্গিস খানের নাতি চীনের সম্রাট কুবলাই খানের প্রিয় খাবার ছিল এই ভেড়ার মাংসের চানাসান মাখ আর তার সঙ্গে দুধ আর সদ্য বন থেকে সংগ্রহ করা মধু। বাঙালি জিহ্বায় মনে হয় চানাসান মাখ ডিশটি একটু পানসে মনে হতে পারে। তবে ইদানীং শহুরে মঙ্গোলীয়রা কিছু মসলার ব্যবহার শুরু করেছে।
এ ছাড়া আরেকটি টক স্বাদের ড্রিংক ছিল। সেটা ছিল সিবাকথর্ন বা সিবেরি ফলের রস। সিবাকথর্ন আসলে একটা ছোট কমলা রঙের টক ফল। ঠাণ্ডার মধ্যে এই গরম টক রস খেতে বেশ ভালোই লাগছিল। তবে আমার মতো নাদান টাইপের অতিথিরা এই টক ফলের রসের মধ্যেই সন্তুষ্ট থাকলেও অনেকেরই চোখ ছিল আরো বেশি তেজি রসের দিকে। প্রতি টেবিলে ওই তেজি রস অর্থাৎ ওয়াইনের পর্যাপ্ত জোগান ছিল আর যথারীতি সে ওয়াইন ব্র্যান্ডের নাম ছিল সেই চেঙ্গিস খানের নামে। প্রতিটি বোতলে চেঙ্গিস খানের সাদাকালো স্কেচ প্রিন্ট করা ছিল।
এ ছাড়া সেদিন আরো যেসব খাবার ছিল, সেগুলো ছিল প্রধানত কন্টিনেন্টাল ডিশ বা আমাদের পরিচিত ডিশ। তাই সেগুলোর বর্ণনা এখানে প্রয়োজন মনে করছি না। তবে আগেই বলেছিলাম, গানবাতার কথার পিঠে কথা বলার জন্য মুখিয়ে ছিল। তাই যখন তাকে বললাম যে খাবার সম্পর্কে আমার আর জানার দরকার নেই, তখন তার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। কথা তো তাকে বলতেই হবে। কথায় বলে, পড়েছো মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে। এবার দেখলাম নতুন ভার্সন,
পড়েছো মঙ্গোলের হাতে,
কথা সব তোমার সাথে।
মাহফুজুল হক জগলুল
২০, অক্টোবর, ২০২২
*এখানে পোস্ট করা অনেক ছবি স্থপতি আনোয়ার সেলিম ভাইয়ের তোলা


