যা ভেবেছিলাম তাই, রিসেপশনিস্ট বুর্জিগিন আমার প্রশ্নটা মোটেও পছন্দ করেনি। সে ভেবেছে, ওকে নিয়ে আমি কৌতুক করার চেষ্টা করেছি। ওর চাহনিতেই ওর বিরক্ত মনোভাব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তবে সে যতোই অপছন্দ করুক আমাকে সে ছাড়তেও চাচ্ছে না। সে চাচ্ছে আমার সঙ্গে আরো অনেকক্ষণ গল্প করতে। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি তখন রাত প্রায় ২টা বেজে গেছে। আমার ঘুমাতে যাওয়া উচিত; কিন্তু বুর্জিগিনকে দেখলাম বড়োসড়ো আড্ডার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যতোই রাত হোক, আমি বুঝতে পারলাম, ওকে খুঁচিয়ে দেওয়ায় লাভ হয়েছে। এবার অনেক কিছু শোনা যাবে ওর কাছ থেকে। এমন সুযোগ আর নাও আসতে পারে। একটি রাত না হয় একটু দেরিতেই ঘুমালাম, যদিও সকালে আমার জরুরি অন্য প্রোগ্রাম আছে। ‘শরীরের নাম মহাশয়, যাহা সহাও তাহাই সয়’—এই থিওরিতে আস্থা রেখে রাত জেগে ওর গল্প শোনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। যা হয় হবে।
ও মোটামুটি একটা হালকা রাগী স্বরে অনেকটা প্রতি-আক্রমণের ভঙ্গিতে কথা বললো,
তুমি আমার নামের নীল-ধূসর নেকড়ে আর পূর্ণিমা নিয়ে কৌতুক করার চেষ্টা করছো; কিন্তু তোমরা যারা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম অনুসরণ করো তোমাদের চিন্তা-ভাবনা অনেক রেজিমেন্টাল, তোমরা হাজার বছর ধরে পৌরাণিক কাঠামোর ওপর গড়ে ওঠা আমাদের আধ্যাত্মিক মনস্তত্ত্বকে বুঝতে পারবে না। এই মহাবিশ্ব নিয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনা তোমাদের থেকে একদমই ভিন্নতর। আমরা মনে করি, আমরা সবাই স্বর্গের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। স্বর্গের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য আমাদের কোনো মাধ্যমের দরকার হয় না। তাই পূর্ণিমার সঙ্গে আমাদের স্বর্গীয় যোগাযোগের কোনো সম্পর্ক নেই।

আমি আসলে ওর নাম নিয়ে মোটেও কৌতুক করিনি; কিন্তু আমি ওর কথার প্রতিবাদ করলাম না, প্রতিবাদ করলে ওর গল্প বলার ফোকাস নষ্ট হয়ে যাবে, তাতে আমারই ক্ষতি বেশি। মাঝে মাঝে বড়ো কিছু পেতে হলে ছোটখাটো পরাজয় মেনে নিতে হয়। তবে এতোটুকু বলেই ও চুপ করে রইলো। আমি দেখলাম, ওর রাগ ভাঙাতে হলে নতুন কোনো আলাপ উসকে দিতে হবে। তাই আমি আমার প্রিয় বিষয় বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর আধ্যাত্মিকতার ধরন নিয়ে সব সময় যে প্রশ্নগুলো করি সেগুলো করার মনস্থির করলাম। আমি ওর কাছে যাযাবর মঙ্গোলদের ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা আর পারলৌকিক বিশ্বাস নিয়ে জানতে চাইলাম।
দেখলাম আমার কথা শুনেই ওর চোখ আবার যেন জ্বলজ্বল করে উঠলো। ও বললো,
এ ব্যাপারে আমার কাজিন তোমাকে খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে পারবে। ও এই হোটেলের পাশের ইউনিভার্সিটি অব হিউম্যানিটিজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, পুমা হোটেলের কাছেই একটা প্রাইভেট ডরমিটরিতে আরো কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে ও থাকে। তুমি অনুমতি দিলে এখনই ওকে ডাকতে পারি।
আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এ রকম একটা প্রস্তাব ও দিতে পারে। রাত তখন ২টা বেজে গেছে, এমন সময় ঘুম থেকে উঠিয়ে জ্ঞান বিতরণের জন্য কাউকে ডাকা যায়? আমার মনে হলো অনেক হয়েছে, এ ব্যাটার সঙ্গে এতো আলাপ করাই উচিত হয়নি। ব্যাটা তো বদ্ধ পাগল। এ পাগলকে আসকারা দেওয়া আমার মোটেও উচিত হয়নি। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ও বোধ হয় আমার মনের কথা বুঝে গিয়েছিল, ও তৎক্ষণৎ বললো,
তুমি যা ভাবছো তা না। ওরা প্রায় সারা রাত এমনিতেই জেগে জেগে আড্ডা দেয়। আমি এখানে জয়েন করার আগে প্রায়ই ওদের ওখানে রাত কাটাতাম আর সারা রাত ওদের সঙ্গে আড্ডা দিতাম।
আমি বলালাম,
সারা রাত জেগে থাকলে ওরা পরের দিন ক্লাসে যায় কীভাবে?
আমার কথায় বুর্জিগিন মিটিমিটি হেসে বললো,
তুমি মনে হয় খুব সুবোধ ছাত্র ছিলে, তাই তুমি জানো না প্রায় সারা রাত জেগে থেকেও সারা পৃথিবীর অনেক ছাত্রই পরের দিন ক্লাস করতে পারে।
ওর কথায় আমি আর কী বলবো, আমি নিজেই ছাত্রজীবনে এমন অনেক রাত আড্ডা মেরে বা রাজনৈতিক মিটিং করে কাটিয়ে দিয়ে পরের দিন পেশাদার গাঁজাখোরের মতো টকটকে লাল চোখ নিয়ে ক্লাসে হাজির হয়েছি। তবু আমি এই গভীর রাতে নতুন আপদ আমদানির ঝুঁকি নিতে চাচ্ছিলাম না, আর ততোক্ষণে আমার শরীরও আর নিতে পারছিল না। তবে কে শোনে কার কথা, বুর্জিগিনের দিকে তাকিয়ে দেখি সে ফোনে তার তথাকথিত কাজিনের সঙ্গে মঙ্গোলীয় ভাষায় কথা শুরু করে দিয়েছে আর কথার মাঝখানে হেসে লুটিয়ে লুটিয়ে পড়ছে। ওর অমন হাসার শব্দ আর লুটিয়ে পড়া দেহভঙ্গিতে আমি নির্ঘাত বুঝতে পারছিলাম যে ও ওর কাজিনকে বলছে, ‘ছিল’ মারার জন্য বড় সাইজের এক উপাদেয় ফরেন মক্কেল পাওয়া গেছে, তাড়াতাড়ি চলে আসো।
একটু পরেই আমার অনুমান সত্য প্রমাণিত হলো। ও বললো,
তুমি যদি ওকে Double Whopper burger with extra cheese with coffee খাওয়াতে রাজি হও তবে ও এখনই এসে তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাবে।
এতো রাতে বার্গার আর কফি কোথায় পাবে?
আমাদের হোটেল তো সুখবাতার স্কয়ার থেকে মাত্র তিন-চার মিনিটের পথ আর সুখবাতার স্কয়ারের পশ্চিম দিকের চেঙ্গিস এভিনিউতে অনেক খাবারের দোকান সারা রাত খোলা থাকে। ওখান থেকে খাবার আসতে দশ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না।
Double Whopper burger with extra cheese
আমি তখনো ভাবছিলাম, খাল কেটে এই গভীর রাতে এ ধরনের বড়ো সাইজের এলিগেটর আমদানি করা ঠিক হবে কি না, আমার দোনোমোনো ভাব দেখে ও বললো,
ও সোশিওলজির ছাত্র হলেও মঙ্গোল ইতিহাস ও গুলে খেয়েছে, এতো সস্তায় তুমি এমন জ্ঞান আর কোথাও পাবে না।
এই ব্যাটা এরই মধ্যে বুঝে গেছে আমাকে কীভাবে সাইজ করতে হয়। আমি ভেবে দেখলাম এমন সুযোগ আর নাও আসতে পারে আর সামান্য একটা বার্গার আর এক কাপ কফির দাম আর কী-ই বা হবে। তবে আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই খুব সম্ভবত আমাকে শোনানোর জন্যই এবার ইংরেজিতে ও বললো,
Come, come, he is waiting for you.
ইংরেজি ভাষার অনেক দুর্বলতার মধ্যে অন্যতম একটি দুর্বলতা হছে you বলতে তুমিও বোঝায় আবার তোমরাও বোঝায়। এবার বুঝলাম বুর্জিগিন দ্বিতীয় টাইপের you বোঝাতে চেয়েছিল, কেননা প্রায় পনেরো মিনিট পর বুর্জিগিনের কাজিনসহ মোট তিনজন এসে আমাদের আড্ডায় যোগ দিলো। খুব সম্ভবত এরা ওর কাজিনের সেই সারা রাত জাগা রুমমেট অথবা হাউসমেট। আমি বুঝতে পারলাম এখন আমাকে একটার বদলে তিনটা Duuble Whopper burger with extra cheese আর তিন কাপ কফির দাম দিতে হবে। নিজেকে তখন অসহায় মক্কেল মক্কেল বলে মনে হচ্ছিল। কাজিন হিসেবে যাকে পরিচয় করিয়ে দিলো সে অনেকটা চে গুয়েভারা টাইপের দাড়ি আর ঝাঁকড়া চুলওয়ালা, পরনেও চে গুয়েভারার মতো ঢিলেঢালা মোটা সুতির কাপড়ের প্যান্ট আর জ্যাকেট, গলায় গেরুয়া রঙের মাফলার, অনেকটা তরুণ বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী টাইপের ভাবসাব। ঠোঁটে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক চিকন এক ধরনের সিগারেট ধরানো। মিটিমিটি হেসে নিঃসংকোচে আমার দিকে হাত বারিয়ে দিয়ে অদ্ভুত কৌশলে ঠোঁট থেকে সিগারেট না সরিয়েই বললো,
Good morning sir, my name is Chinua. Chinua means ‘blessings of God’.
ইংরেজি ভাষার আরো একটি দুর্বলতা হলো, রাত আড়াইটার সময়ও বলতে হচ্ছে good morning, যদিও morning হতে তখনো চার ঘণ্টার বেশি বাকি। আসলে এটা ওদের ভাষার ব্যাপার, না ওদের সংস্কৃতির ব্যাপার? আমরা প্রয়োজনে ওদের ভাষা না হয় নিলাম, ওদের সংস্কৃতি নেবো কেন? ভাষা থেকে সংস্কৃতি কি আলাদা করা যায়? রাত আড়াইটার সময় দেখা হলে কী বলে সম্মোধন করা উচিত? অনেক পণ্ডিতের মতে, রাত সাড়ে ৪টার আগে good morning বলা সঠিক নয়। তাহলে রাত আড়াইটায় good evening বলা উচিত? মহা প্যাচালো ব্যাপার। পৃথিবীর সব বড়ো প্যাঁচের পেছনে আছে ব্রিটিশরা, এখানেও তাই। আমাদেরটাই বরং সবচেয়ে উপযোগী আর লাগসই , দ্বিপ্রহর বা গভীর রাত কিংবা একদম ভোরবেলা, যখনই দেখা হোক না কেন, সালামু আলাইকুম, ‘কেমন আছেন ভাইজান’ বা ‘নমস্কার, দাদা ভালো তো?’ এই বলে পার করে দিতে পারি যেকোনো পরিস্থিতি।
দ্বিতীয় জন বেটেখাটো ধরনের নাক থ্যাবড়া আর ঘুম ঘুম চেহারার এক যুবক। সে ব্যাটা হাত বাড়িয়ে দিয়েই ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললো,
Good night, my name is (কী নাম বলেছিল তা মনে নেই, তবে মনে মনে ওর নাম দিয়েছি Mr. Good Night)।
হয়তো প্রথম সাক্ষাতেই good night বলায় সে ধাক্কা সামলাতে গিয়ে আমি আর ওর নাম মনে রাখতে পারিনি।
ইংরেজি ভাষার এই আরেক ক্যাচাল, good night শুধু বিদায়ের বেলায় বলা যাবে, আগমনের সময় বলা সারাসার হারাম। ব্রিটিশদের এই প্যাঁচের শানেনুজুল কে জানে, good morning, good afternoon আর good evening যদি দেখা হওয়র সঙ্গেই বলা যায় তাহলে কোন যুক্তিতে good night বলা যাবে না?
এবার তৃতীয় জনের সঙ্গে হাত মেলানোর পর্ব, বেশ মোটাসোটা ভুঁড়িওয়ালা একজন মানুষ, ছেলে না বলে একে ভদ্রলোক বলাই শ্রেয়। কেননা নির্ঘাত ওর বয়স ওদের দুজনার চেয়ে অন্তত আট-দশ বছর বেশি হবে। ওকে দেখে আমি ভাবছিলাম এদের ইউনিভার্সিটিতেও কী আমাদের আমলের বুয়েটের মতো অভিজ্ঞ ও প্রাচীন ‘ভাইজান’ জাতীয় ছাত্র আছে? আমাদের সময় বুয়েটে খুব সম্ভবত নিয়ম ছিল যে, যে যতো বছর ইচ্ছা ড্রপ দিতে পারবে; কিন্তু তাদের ছাত্রত্ব চিরস্থায়ী থাকবে। এনারা বছরের পর বছর, কেউ কেউ আবার এক দশকেরও বেশি সময় ছাত্র হিসেবে কাটিয়ে দিতেন। ভাইজানরা বুয়েটের হলগুলোকে তাদের স্থায়ী নিবাস বানিয়ে ফেলেছিলেন। অনেকে পলাশীর কাঁচা বাজার থেকে মাছ-মাংস আর তরিতরকারি কিনে এনে রুমের ভেতর লুকিয়ে রান্নাবান্না করতেন। পাশের রুম থেকে তাদের মুসুরির ডাল বাগার দেওয়ার শব্দ শোনা যেতো। এদের বেশির ভাগই ছিলেন খুব অমায়িক আর ছাত্র মহলে প্রচণ্ড জনপ্রিয়। হলের ছাত্রদের কাছে এঁরা ছিলেন অনেকটা যৌথ পরিবারের বড়ো ভাই আর বড়ো চাচার মাঝামাঝি ধরনের অভিভাবক টাইপের গুরুজন ও বন্ধু। এঁরা প্রায় সবাই খুব পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করতেন। খুব সকালে উঠে নিয়মিত ব্যায়াম করতেন। বিকেলে দলবেঁধে নিউ মার্কেটের দিকে বেড়াতে যেতেন। ডাইনিং হলে একদম প্রথম ব্যাচেই খাবার খেতেন। এঁদের জন্য টিভি রুমে সামনের কয়েকটা চেয়ার খালি রাখা হতো, ওনারা খেয়ে এসে সম্রাটের মতো সে চেয়ারে এসে বসতেন। এদের মধ্যে শুধু একজন ছিলেন, যিনি তাঁর হলের বারান্দায় ফুলের টবে খুব দরদ দিয়ে গাঁজা চাষ করতেন, গাছে নিয়মিত পানি দিতেন, সার দিতেন। নিজেদের স্বার্থেই এঁরা প্রতিবছর নতুন জুনিয়রদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতেন, অনেকটা প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা চরিত্রের মতো এক একজন। এঁদের কেউ কেউ আবার বিবাহিতও ছিলেন। বুয়েটের অনেক শিক্ষকও ছিলেন এঁদের চেয়ে অনেক জুনিয়র, সেই সব শিক্ষককে ওনারা তুমি বলে সম্মোধন করতেন, এটা-সেটা হুকুমও করতেন।
বুয়েটের এ রকম একজন ‘ভাইজান’কে নিয়ে আমার নিজের জীবনের এক মজার সত্য ঘটনা মনে পড়ে গেল। পূর্ববঙ্গের ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় গিয়ে ‘পেন্নাম’ উচ্চারণ করায় তাঁকে রফলা ব্যবহার করতে বলা হয়েছিল, তখন তিনি রেগে গিয়ে সম্পূর্ণ বাক্যেই রফলা বসিয়ে দিয়ে বলেছিলেন,
দ্রিম্রু য্রখ্রন ত্রখ্ররন স্রবট্রাতেই দ্রিম্রু।
আমিও পূর্ববঙ্গের খাস বরিশাইল্লা বাঙাল, তাই গল্প যখন লিখতে বসেছি তখন সব গল্পই বলে নিই। স্বাধীনতার কয়েক বছর পর আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, তখন আমাদের পিঠাপিঠি তিন ভাইকে পড়ানোর জন্য আমাদের বাসায় একজন অত্যন্ত মেধাবী বুয়েট ছাত্রকে হাউস টিউটর হিসেবে রাখেন আমাদের অত্যন্ত ব্যস্ত চাকরিজীবী বাবা। আমাদের বাসায় সিঁড়ির ল্যান্ডিং লেভেলে অ্যাটাচড টয়লেটসহ একটি সুন্দর রুম ছিল। সেখানে তিনি থাকতেন। সকালবেলা হন্তদন্ত হয়ে নাশতা খেয়ে তিনি গুলশান থেকে ৬ নম্বর বাস (পীরজঙ্গী মাজার হইতে গুলশান, বনানী) ধরে ফার্মগেট হয়ে বুয়েটে যেতেন। তিনি ফিরতেন সন্ধ্যার সময়। আমরা তিন ভাই বিকেল থেকেই মহা আগ্রহ নিয়ে তাঁর অপেক্ষায় থাকতাম। ছাত্ররা শিক্ষকের আগমনের জন্য মহা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকার কথা না; কিন্তু আমরা অপেক্ষায় থাকতাম। কেননা তিনি আমাদের সাধারণত কোনো কিছুই পড়াতেন না, আর তাকেও আমরা কখনো পড়াশোনা করতে দেখতাম না। যে শিক্ষক নিজেও পড়ে না আবার ছাত্রদেরও পড়ায় না, এমন শিক্ষককে কী কোনো ছাত্র ভালো না বেসে পারে?
বুয়েট থেকে ফিরে তিনি গোসল করে লুঙ্গি পরে চা-নাশতা খেয়ে পান চিবুতে চিবুতে শুরু করতেন তার সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় বিরামহীন গল্প বলা। এক গল্প তিনি বহুবার বলতেন, কিন্তু তার গল্প বলার কৌশল এতো মজাদার ছিল যে এক গল্প বারবার শুনতেও আমাদের খারাপ লাগতো না। এ ছাড়া তিনি ছিলেন তখনকার দিনের খুব জঙ্গি আর টগবগে একটি বাম রাজনৈতিক দলের সদস্য (দলটির নাম বলতে চাচ্ছি না)। সব সময়ই তিনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলতেন। তখন সিরাজ শিকদারের খুব নামডাক। তিনি আমাদের গর্ব করে প্রায়ই বলতেন যে সিরাজ শিকদার বুয়েটের মেধাবী ছাত্র। আমার এক মামা সিরাজ শিকদারের আন্ডারগ্রাউন্ড দলে ছিলেন, তাই আমরা সবাই তাঁর নাম জানতাম। আমার মনে আছে, সেই গৃহশিক্ষকের সঙ্গেই আমি একটা রেললাইনের মতো উঁচু রাস্তা ক্রস করে জীবনে প্রথম বুয়েটের তিতুমীর হলে গিয়েছিলাম।
তারপর যথারীতি যা হওয়ার তা-ই হয়। আমাদের তিন ভাইয়ের পরীক্ষার ভয়াবহ রেজাল্ট দেখার পর আমাদের সেই বুয়েট ছাত্র গৃহশিক্ষক আমাদের বাসা থেকে চলে যান। তিনি নিজের ইচ্ছায় চলে গিয়েছিলেন, না আব্বার কথায় তিনি চলে গিয়েছিলেন তা আমরা জানতে পারিনি। তবে মজার কথা হলো, এর বহু বছর পর ১৯৮১ সালের শেষ দিকে আমি যখন বুয়েটে ভর্তি হই, তখন একদিন আমার শৈশবের মজার মজার গল্প,বলা মহাবিপ্লবী সেই প্রিয় গৃহশিক্ষককে আবার আবিষ্কার করি শেরেবাংলা হলের নিচতলার একটি রুমে। তখনো তিনি দিব্যি ছাত্র হিসেবে বুয়েটে রয়ে গেছেন এবং দেখলাম তিনি তখন আর বামপন্থী নেই, তখন তিনি মধ্য ডানপন্থী একটি ছাত্রসংগঠনের বড়ো নেতা। এরপর ১৯৮৮ সালে আমার বুয়েট পর্ব শেষ হয়। বুয়েটে আমার শেষ বর্ষেও তাঁকে হলে দেখেছি, তবে যতোদূর শুনেছি ওই বছর তিনিও পাস করে আমার সঙ্গেই বুয়েট পর্ব শেষ করেন। এরশাদ ভ্যাকেশনের কারণে প্রলম্বিত বুয়েটে আমার দীর্ঘ ছয়-সাত বছরের জীবনে বহুবার আমরা মুখোমুখি হয়েছি; কিন্তু তিনি আমাকে কখনোই চিনতে পারেননি। তবে আমি তাঁকে ঠিকই চিনেছি; কিন্তু তিনি লজ্জা পেতে পারেন এই আশঙ্কায় আমি কখনোই আমার পরিচয় তাঁর কাছে প্রকাশ করিনি। তিনি কোনো দিন জানতেও পারেননি আশৈশব লালিত এক বুক ভরা গভীর ভালোবাসা নিয়ে তাঁর এক ছাত্র তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতো সব সময়।
গল্প বলতে বলতে মঙ্গোলিয়া থেকে চলে গেছি বুয়েটে। কোথায় উলানবাটোর আর কোথায় পলাশী। আমার ধারণা, অতি সামান্য যে কজন আমার লেখা পড়েন তাঁদের অনেকেই এখন বিরক্ত। পাঠক ছুটে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। যা হোক, মাফ চাই, আবার ফিরে আসি হোটেল পুমার রাত ৩টার গল্পের আড্ডায়।
চিনুয়ার সেই ‘ভাইজান’ টাইপের ভদ্রলোক ছাত্র এবার আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো; কিন্তু তার নাম বললো না। ব্যাটা মহা বুদ্ধিমান, good morning বা good evining এজাতীয় কোনো ক্যাচাল মার্কা সম্ভাষণের ভেতর দিয়ে না গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত ভক্তি গদগদ ভাব দেখিয়ে বারবার মাথা ঝুঁকিয়ে শুধু বললো,
Yes, yes.
আমিও উত্তরে বললাম,
Yes, Yes.
সে কেন Yes, yes বললো আর আমিই বা কেন Yes, yes বললাম জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবো না। রাত ৩টার পর মানুষ নাকি কিছুটা অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে, অথবা হয়তো ওটাই তার স্বাভাবিক আচরণ। সামাজিকতার খোলস ছেড়ে তখন হয়তো আস্তে আস্তে মানুষের আসল রূপ বেরিয়ে আসে। সম্ভাষণ পর্ব মোটামুটি শেষ হওয়ার পর আমি বুর্জিগিনকে মঙ্গোলদের ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা আর পারলৌকিক বিশ্বাস নিয়ে যে প্রশ্নটা করেছিলাম সেটা এবার চিনুয়াকে করলাম। ও খুব মনোযোগসহকারে দ্বিতীয় সিগারেট ধরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। প্রশ্নটা করার পর ওর মিটিমিটি হাসি আরো প্রশস্ত হলো, আগের মতোই ঠোঁটে সিগারেট ধরে রেখেই ও বললো,
আগে বার্গার আসুক, কফি খাই, তারপর কথা শুরু করি। পেট খালি থাকলে আমার মুখ দিয়ে শব্দ বের হতে চায় না।
মোটা ভাইজানকে দেখলাম ওর কথায় খুব সমর্থন জানিয়ে জোরে জোরে মাথা নাড়িয়ে বললো,
Yes, Yes.
আমি বুঝতে পারলাম এ ত্রিরত্নের সব রত্নই মহা সেয়ানা, আগে পেমেন্ট পরে সার্ভিস, খাবার না খেয়ে মুখ খুলবে না, বরং চিনুয়া উল্টো আমাকে প্রশ্ন করলো,
আমরা সবাই আমাদের নাম বললাম, তোমার নাম তো আমাদের বললে না ।
আমার মেজাজ একটু গরম হচ্ছিল, তবু মাথা ঠাণ্ড রেখে নাম বললাম, পেশা বললাম, কেন মঙ্গল গ্রহে না গিয়ে মঙ্গোলিয়া এসেছি তাও বললাম।
এবার আবার সেই পুরনো প্রশ্ন—
তোমাদের সবার নামই এমন লম্বা হয়? তোমার নাম এতো লম্বা কেন?
নাম এতো লম্বা কেন সে ব্যাপারে অনেক সময় নিয়ে বুর্জিগিনকে আগেই বিস্তারিত বলেছি, এই শেষ রাতে আবার সে রয়ানী গান গাওয়ার ধৈর্য আমার নেই, তাই সে একই প্রশ্ন শুনে মেজাজ আরো গরম হতে শুরু করলো।
মোটা ভাইজান এবারও বললো,
Yes, Yes.
মনে হচ্ছিল, অনেক হয়েছে এবার খ্যান্ত দিয়ে রুমে গিয়ে ঘুমাই। কিন্তু চিন্তা করে দেখলাম, রুমে যাই আর যা-ই করি এ চারজনের বার্গার আর কফির টাকা তো আমাকে দিতেই হবে। কেননা অনেকক্ষণ আগেই ফোনে খাবারের অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে। যেকোনো প্রজেক্টে ইনভেস্ট করলে ইনভেস্টরকে অনেক ধৈর্য ধরতে হয়, তাই আমিও মেজাজ ঠাণ্ডা রেখে ধৈর্য ধরতে চেষ্টা করতে লাগলাম। কোয়ান্টাম মেথডের মেডিটেশন কোর্সে অংশগ্রহণের সময় গুরুজি মহাজাতক বলেছিলেন মাথা গরম হলে একশ থেকে পেছনের দিকে গোনা শুরু করতে আর লেখক হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন হাতের কাছের কাচের গ্লাস ভেঙে ফেলতে। এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে কোনো কাচের গ্লাস দেখলাম না, তাই একশ থেকে পেছনের দিকে গোনা শুরু করলাম। উল্টো দিকে গুনতে অনেক মনোযোগ দিতে হয়, সেটা করতে গিয়ে দেখলাম মেজাজ আরো গরম হতে শুরু করেছে। তবে মেজাজ আরো গরম হওয়ার আগেই এক মঙ্গোলীয় তরুণ একটা সাইকেলে করে আমাদের অর্ডার করা খাবার নিয়ে এসে হাজির হলো।
মাহফুজুল হক জগলুল
১৭ নভেম্বর, ২০২২
