স্থপতি মলয় কুমার ঘোষ

পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত বাঙালি স্থপতি মলয়। এতো বিনয়ী, নির্বিবাদী আর এতো কোমলপ্রাণ মানুষ আমি আমার জীবনে কম দেখেছি। সব সময় মুখজুড়ে একটা অদ্ভুত সুন্দর প্রশ্রয়ের সরল হাসি। মলয়ের প্রধান গুণ হচ্ছে মানুষকে ভালোবাসার অদ্ভুত ক্ষমতা। আমি নিজেও ওর সে অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছি গভীরভাবে। মলয়কে দেখলেই তাই আমার হিন্দি সিনেমার সেই বিখ্যাত ডায়ালগটা মনে পড়ে যায়, সেটা হচ্ছে,

দোস্ত, এতনা পেয়ার মাত দো যো কলিজা ফাট যায়।

জানি না হিন্দিটা সঠিক হলো কি না, তবে ব্যাকরণ না নিয়ে শুধু ভাবটা নিলে মনে হয় আমার মনের কথাটা বোঝা যাবে আর এখানে কলিজা মানে যকৃত নয়, এখানে কলিজা মানে হচ্ছে হৃদয়।

অনেক বছর আগে ভারতীয় সীমান্ত বাহিনীর হাতে নিহত ও ধর্ষিতা কিশোরী ফেলানীকে নিয়ে আমি একটা কবিতা লিখেছিলাম, কলকাতার আরেক প্রিয় অগ্রজ স্থপতি দিলীপদা সেটা আবৃত্তি করছিলেন মলয়ের উপস্থিতিতে। সেই থেকে আজ অব্দি আমার সঙ্গে দেখা হলেই মলয় ফেলানীর সে কবিতাটির কথা মনে করিয়ে দেয়। ঘটনাটি ছোট মনে হলেও আমার কাছে ঘটনাটি কিন্তু মোটেও ছোট না। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, ক্ষুদ্র জাতীয়তাবাদের আচ্ছন্নতাকে অতিক্রম করে মলয় সত্যের পক্ষে, মানবতার পক্ষে থাকতে কোনো দ্বিধাবোধ করেনি। এখানেই মলয় আমার কাছে অনন্য। আমাদের ও ওদের পূর্বপুরুষরা এমন মানবিক হলে আমাদের সকলের অতীত ইতিহাস হয়তো অনেক সুন্দর হতে পারতো, আমাদের সকলের মানচিত্র হয়তো অন্য রকম হতে পারতো, অনেক বেশি মানবিক হতে পারতো।
মলয়সহ পশ্চিমবঙ্গের স্থপতিরা যখনই ঢাকায় আসে অনেক রাত পর্যন্ত চলে আমার আড্ডা। গভীর রাতে আড্ডা শেষে যখন বাড়ি ফিরি তখন আমার স্ত্রী রাগী স্বরে জিজ্ঞেস করে এতো দেরি কেন হলো? আমি তখন মুখমণ্ডলে খুব গম্ভীর একটা ভাব এনে বলি, এপার বঙ্গ আর ওপার বঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ অফিশিয়াল মিটিং চলছিল, আমাদের দুই বঙ্গের মানুষের ভাগ্য নির্ভর করছে আমাদের ওপর। আমার স্ত্রী তৎক্ষণৎ জিনিসটাকে খুব সিরিয়াসলি নেয় এবং তার রাগ কমিয়ে ফেলে। বিছানায় শুয়ে শেষ রাতে যখন ঘুমুতে যাই তখন মনে হয়, সত্যি সত্যি আমাদের দুই বঙ্গের মানুষের ভবিষ্যৎ আসলেই নির্ভর করছে আমাদের মতো দুই বঙ্গের সাধারণ মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বাস আর অবারিত বন্ধুত্বের ওপর। এমন একটা পরম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রাজনীতিবিদদের মতো স্বার্থপরদের ওপর ছেড়ে দিলে চরম বোকামি হবে। দ্বিতীয়বার আমরা যেন সে বোকামিটা না করি।

মলয়ের সর্বদা উচ্চারিত যে শব্দটা সবচেয়ে বেশি আমার কানে বাজে সব সময় সেটা হচ্ছে,

Awesome দাদা, Awesome.

সবার ভালো কাজগুলোকে ও সব সময় Awesome, Awesome বলে উৎসাহ দেয়। আসলে মলয় নিজেই জানে না যে, ও নিজেই এক ভীষণ Awesome ব্যক্তিত্ব, আমার অনেক প্রিয় Awesome ব্যক্তিত্ব। আজ আমার প্রিয় সেই Awesome মলয়ের শুভ জন্মদিন। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন ওকে ও ওর পরিবারের সবাইকে সুস্থ রাখেন, ভালো রাখেন, সুখ ও সাফল্যের মধ্যে রাখেন সারা জীবন।

১৬ নভেম্বর, ২০২২

আরও পড়ুন