অনেক দিন ধরেই একটা জিনিস আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছি। সেটা হচ্ছে ঢাকা শহরের অটোরিকশাওয়ালারা জবরদস্ত ইসলাম ধর্মপ্রিয়। প্রায় ৮০ শতাংশ অটোরিকশার পেছনেই লেখা থাকে,
আল্লাহ সর্বশক্তিমান।
বাকি অটোগুলোর পেছনেও লেখা থাকে ‘নামাজ বেহেশতের চাবি’ বা ‘নামাজ কায়েম করুন’, এ-জাতীয় ইসলাম ধর্মের খাস হেদায়েতমূলক নীতিবাক্যসমূহ। ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার অটোরিকশা অনেকটাই দুর্লভ। সে তুলনায় রিকশাওয়ালা বা বাস-ট্রাকওয়ালারা মোটেও তেমন ধর্মভীরু নয়, বরং তাদের লেখাগুলো অনেকটা ফাজিল কৌতুকরসে সিক্ত গভীর ভার্নাকুলার দার্শনিক বাণী সমৃদ্ধ অথবা পরম মাতৃভক্তিতে উদ্দীপ্ত লেখাজোখা (বাবারা সন্তানদের জন্য জান কোরবান করে দিলেও বাবাদের নিয়ে ভালোবাসার কথা কোনো দিন কোথাও লেখা দেখিনি)। ট্রাক বা বাসের এমন কিছু লেখা এখানে তুলে দিচ্ছি,
জন্ম থেকে জ্বলছি।
মামা সাইড দেন।
আগের মতো আর শান্তি নাই।
ছেলেকে জীবন দাও, বাইক নয়,
মেয়েকে শিক্ষা দাও, মোবাইল নয়।
লাগাইবেন না, লাগাইলেই ক্ষতি।
ছি, তুমি এতো কাছে।
থামলে ভালো লাগে।
মামা ঢাকা কতো দূর।
হর্ন দিবেন না, দরকার হইলে উড়িয়া যান।
মায়ের দোয়া।
মা-ই আপন বাকি সব বিজ্ঞাপন।
এ ছাড়া আজকাল অনেক ট্রাকের পেছনেই লেখা দেখছি,
ট্রাফিক আইন মেনে চলুন।
সব লেখার মধ্যে এই লেখাটাকে আমার গভীরতম কৌতুকরসে সিক্ত বলে মনে হয়েছে। কেননা ট্রাফিক আইন ভঙ্গের মহা ওস্তাদ সেই ট্রাকের গায়েই যদি ট্রাফিক আইন মেনে চলার পরম হিতোপদেশ
লেখা থাকে এর চেয়ে বড়ো কৌতুক এ জগতে আর কী-ই বা হতে পারে।
এই লেখাগুলো কিন্তু এক অর্থে আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সামাজিক মনস্তত্ত্বের একটা একটা খণ্ডচিত্র এবং একই সঙ্গে তাদের চরম বুদ্ধিদীপ্ত গভীর রসবোধেরও স্মারক। এরা লেখকও না, চিত্রকরও না, আবার সাংবাদিকও না; তার পরও সমাজের একজন জীবন্ত এবং একই সঙ্গে প্রায় ক্ষমতাহীন সদস্য হিসেবে তাদের মনোজগতের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া প্রকাশের যে শাশ্বত আকাঙ্ক্ষা তাদের কাছে সেটা প্রকাশের একমাত্র ক্যানভাস হয়ে উঠেছে এই বাস বা ট্রাকের গাত্র। তাই স্বাভাবিকভাবে সেটার সদ্ব্যবহারের সুযোগ পেলে কখনোই তারা সে সুযোগ হাতছাড়া করে না। তবে যেসব বাস কর্পোরেট মালিকানায় চলে গেছে, তারা এসব লেখাজোখা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকে। তারা আমাদের নিজস্ব ভার্নাকুলার গ্রাফিকস থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ ওয়েস্টার্ন গ্রাফিকসে তাদের বাসগুলো সাজায়। আমার মনে হয় এ পুরো ব্যাপারটা নিয়ে সিরিয়াস সমাজতাত্ত্বিক-মনস্তত্ত্বভিত্তিক গবেষণা হতে পারে।
১১ জানুয়ারি, ২০২৩
