প্রিয় বন্ধু ও সহপাঠী রফিক আজম। বুয়েটে ডিজাইন ক্লাসে শিক্ষকরা গ্রিড সাইজ, কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়াল, ফরামাল এন্ট্রি, সার্ভিস এন্ট্রি, টার্নিং রেডিয়াস ইত্যাদি খটখটে বিষয় নিয়ে যখন রফিককে বোঝাতে চাইতেন রফিক তখন বৃষ্টি, মেঘ, রংধনু, গাছপালা, রৌদ্র আর ছায়া, এসবের গুরুত্ব নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতো। বেশির ভাগ শিক্ষকই একসময় বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিতেন। কিন্তু রফিক হাল ছাড়তো না। আজও ও হাল ছাড়েনি, বরং প্রচণ্ড একাগ্রতা আর বিশ্বাস নিয়ে ও বৃষ্টি, মেঘ, জল, রংধনু, বৃক্ষ, রৌদ্র আর ছায়া, এসবকে স্থাপত্যের সিনথিসিসে সাফল্যের সঙ্গে ইন্টিগ্রেট করছে। শুধু দেশে নয়, সারা পৃথিবীর মানুষকে ও স্থাপত্যের সঙ্গে এসবের সংশ্লিষ্টতাকে সার্থকভাবে বুঝিয়েছে এবং ওর অপরূপ সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে সর্বজনীনভাবে প্রমাণও করেছে।
আমরা তিতুমীর হলে নর্থ ব্লকের দোতলার একদম পুবদিকের রুমটায় থাকতাম। হরতালের সময় ওই রুমের বারান্দা থেকে অনায়াসে পলাশীর মেইন রাস্তায় ককটেল মারা যেতো, কষ্ট করে নিচে নামতে হতো না। একটা মারলেই সকাল-সন্ধ্যা হরতাল সফল। সন্ধ্যার সময় আর একটা মারলে লাগাতার হরতাল নিশ্চিত। এসব কার্যকলাপের কারণে আমাদের যন্ত্রণায় রুমের দুজনের খাট প্রায়শই খালি থাকতো। রফিক সারা রাত ফ্যাকাল্টিতে কাজ করে খুব ভোরে আমাদের রুমে আসতো ঘুমাতে। ও এসে যখন দরজায় টোকা দিতো, আমাদের ঘুমের তখন মাত্র মধ্য পর্যায় চলছে। এই অবস্থায় কে কাঁচা ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলতে যাবে। কিন্তু রফিক হাল ছাড়ার মানুষ না, পুরান ঢাকার মানুষ হলেও ও খুব ভদ্র ও প্রমিত বাংলা ভাষায় খুব নরম স্বরে বলতে থাকতো,
এই, এই, তোরা দরজা খুলছিস না কেন?
আমরা কম্বলের নিচে মুখ চাপা দিয়ে হাসতে থাকতাম; কিন্তু দরজা খুলতে অনেক দেরি করতাম। এটাই বোধ হয় ছিল আমাদের মজা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,
কৌতুক নিম্নমাত্রার দুঃখ।
যেকোনো কৌতুকে কেউ না কেউ কিছুটা হলেও দুঃখ পাবে। এটাই জগতের নিয়ম। এ ক্ষেত্রে রফিককে আমরা মৃদু দুঃখ দিতাম।
আমরা যখন দরজা খুলতাম রফিক তখন উল্টো আমাদের নিয়ে কৌতুক করতো, কখনো রাগ করতো না। ও যে আমাদের দুষ্টুমি বুঝতো না তা কিন্তু না, ও ঠিকই বুঝতো কিন্তু ও কখনো রাগ করতো না। এটাই রফিক আজম।
আমাদের দীর্ঘ প্রায় চল্লিশ বছরেরও বেশি বন্ধুত্বের বয়সে আমি মনে করতে পারি না ওকে কখনো রাগতে দেখেছি বা কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে দেখেছি। আজ রফিকের জন্মদিন। জন্মদিনে রফিককে শুভেচ্ছা আর দোয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সব অগুনতি ক্লান্ত রাঙা ভোরবেলায় ওকে দরজার ওপারে খানিকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ভালো থাকিস বন্ধু।
২৯ ডিসেম্বর, ২০২২