স্থপতি শাকুর মজিদ

শাকুরের কথা মনে হতেই মনে আসে আজ থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের একটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত হাসিখুশি উচ্ছল ছেলে কিছুটা লেডিস ডিজাইনের একটা বিদেশি লাল সাইকেল আর ক্যামেরা নিয়ে বুয়েট ক্যাম্পাস বা তিতুমীর হল থেকে এখানে-সেখানে ঘোরাঘুরি করছে। মানুষ সাইকেল চালায় সাধারণত সামনের দিকে তাকিয়ে, শাকুর সাইকেল চালাতো ডানে-বামে তাকিয়ে, কখনো কখনো আবার পেছন দিকে তাকিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে বলতে। ক্যাম্পাসে যেখানেই কোনো ঘটনা ঘটছে সেখানেই শাকুর হাজির, কখনো সাংবাদিক হিসেবে হাজির, কখনো অবজারভার হিসেবে হাজির। সেই থেকে আজ পর্যন্ত শাকুর খুব ভালো একজন অবজারভার। পরবর্তী সময়ে তার সাহিত্যকর্ম আর লেখালেখিতে এই অবজারভেশনের ব্যাপারটা খুব সুস্পষ্ট। সারা দিন হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে থাকলেও সে নিয়মিত নামাজ পড়তো, অনেকের কাছে এ কথাও শুনতাম, সে গভীর রাতে তাহাজ্জুদ নামাজও পড়ে। স্মৃতি যদি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করে থাকে তাহলে এখনো মনে আছে তিতুমীর হলের সাউথ ব্লকের নিচতলার সিঁড়ির পাশের রুমে তাকে আমি একদিন আবিষ্কার করি একা একা একটা তোশকবিহীন খাটের তক্তার ওপর শুয়ে আছে। রোগাক্লান্ত ও শুষ্ক মুখমণ্ডল কিন্তু সারা মুখে ছড়িয়ে আছে সুন্দর সেই পরিচিত হাসি, তাকে জিজ্ঞেস করতেই বললো তার পিঠে একটা মেজর অস্ত্রোপচার হয়েছে পিজিতে, ডাক্তারের ইনস্ট্রাকশন অনুযায়ী তাকে এভাবে থাকতে হচ্ছে। খুব আশ্চর্য হয়ে শুনলাম, অস্ত্রোপচারসহ সব বিপদ সে মোটামুটি একা একাই সামলিয়েছে এবং আত্মীয়স্বজন বা পরিবার-পরিজন হতে বহুদূরে একা একা এই নির্জন রুমের মধ্যে জীবনের এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে চলেছে। তার সেই অদম্য সাহস আর জীবনীশক্তি সেদিন আমাকে প্রচণ্ড চমৎকৃত করেছিল। পরবর্তী সময়ে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা আরো অনেক বাড়ে। সে অনেকটা আমাদের জুনিয়র বন্ধু হয়ে যায়, যা আজ পর্যন্ত অনেকটা বজায় আছে।

তখনকার অনেক পত্রিকায়ই সে নিয়মিত লিখতো। সেসব কথা সবাই জানে। সে সময় একদিন তারকালোক নামের একটা রঙিন প্রচ্ছদের পত্রিকা সে আমার হাতে দিয়ে বললো, পড়ে দেখেন। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম পত্রিকায় আমার সুন্দর একটা ছবি আর আমার সত্য-মিথ্যা নানা গুণাবলি নিয়ে একটা লেখা সে ছাপিয়েছে। পত্রিকাটি আমি যত্ন করে রেখেছিলাম অনেক দিন, এখন আর খুঁজে পাই না। শাকুরের সঙ্গে বুয়েট জীবনে অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা। কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখবো? সেসব লিখতে হলে অন্য পরিসরে লিখতে হবে। আজ না। এরপর জীবন অনেক এগিয়েছে, আমরা একেকজন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক বদলে গেছি। পঁয়ত্রিশ বছর অনেক সময়। শাকুর আজ ন্যাশনাল সেলিব্রিটি। শাকুরকে সবাই চেনে, শাকুরের গড়ে ওঠার সময়ে আমরাও ওর সঙ্গে ছিলাম, এটা ভেবে খুব ভালো লাগে। পরবর্তী জীবনে হাছন রাজা শাকুরের ভেতরে প্রবেশ করে। খুব গভীরভাবেই প্রবেশ করে। এখন কোনটা আমার সেই চেনা শাকুর আর কোনটা হাছন রাজা তা আমি মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারি না। তবে এখনো সময় আছে হয়তো একদিন বুঝতে পারবো অথবা সব কিছু বোঝার দরকার নেই। আজ আমার প্রিয় ভাইটির জন্মদিন। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা ওর জীবন, কর্ম ও স্বাস্থ্য মঙ্গলময় হোক। শাকুর ভালো থাকুক।

মাহফুজুল হক জগলুল

২১ নভেম্বর, ২০২১

শাকুর আর আমার এ ছবিটি ১৯৮৮ সালে স্থাপত্য বিভাগ ছাত্র সংসদের বন্যার ত্রাণের সময় তোলা। এই অসাধারণ ছবিটি কে তুলেছিল মনে করতে পারছি না বলে দুঃখিত।

আরও পড়ুন