সমুদ্রবিলাস ও পুত্রবিলাস

ছেলেমেয়ে আর তাদের মাকে নিয়ে মালদ্বীপে আছি তিন দিন হলো। সমুদ্রের একদম পাশেই বিশাল ইনফিনিটি পুল। সবাইকে নিয়ে পুলে নেমেছি সাঁতার কাটতে। অনেকক্ষণ সাঁতার কাটার পর দেখলাম স্ত্রী খুব আনন্দিত; তার পরও তার মুখাবয়বে একটা গুমোট ভাব। তার এ গুমোট ভাব আমার পূর্বপরিচিত, পুলের আশপাশে তার স্বামীর চারদিক ঘিরে এতো স্বল্পবসনা বিকিনি পরা নারীদের সমাবেশ সে নিতে পারছে না। স্ত্রীদের চেহারায় হঠাৎ ঘনিয়ে আসা কালবোশেখির মতো কার্যকারণহীন নির্বাক এমনতর গুমোট ভাবের সঙ্গে যাঁরা এ লেখা পড়ছেন তাঁদের অনেকেই পরিচিত; যদিও তাঁরা সেটা স্বীকার করবেন না এখন, সেটা আমি জানি। আমাকে শাকুর মজিদ বলেছে, লেখক হতে হলে সততা খুব প্রয়োজন, সৎভাবে মনের কথা প্রকাশ করা লেখকের কাজ।

আমার ইদানীং লেখক হওয়ার একটা সূক্ষ্ম ইচ্ছা জন্ম নিয়েছে আর তাই প্রায়শই শাকুরের উপদেশে চলছি ইদানীং আর সে কারণে সৎ থাকার প্রাথমিক চেষ্টা হিসেবে দাম্পত্যজীবনের এই অভিজ্ঞতা সৎভাবে সবার গোচরে আনলাম। জানি না, শাকুরের কথা মানতে গিয়ে সব ঘটনা পাবলিক করে শেষমেশ আবার কোন সৎ গৃহযন্ত্রণায় পড়ি। যাই-ই হোক, স্ত্রীকে এ যন্ত্রণা থেকে বাঁচাতে গিয়ে আমি বললাম,
বাচ্চাদের নিয়ে সাঁতরাও, আমি খুব টায়ার্ড, আমি রুমে যাই। দেখলাম স্ত্রীর সারা মুখাবয়বে এক আপদমুক্তির অপার সন্তোষের হাসি ফিরে এসেছে। এ রিসোর্টটা অনেক বড়ো আর ছড়ানো-ছিটানো। পুল থেকে ভিলায় যেতে বাগি নামের ছোট ব্যাটারিচালিত গাড়িতে যেতে হয়। আমি যথারীতি পুল থেকে উঠে ভেজা কাপড় পরে একটা বাগিতে উঠলাম। আমার সঙ্গে একটা মোটামুটি তিন বছরের বাচ্চাসহ উত্তর ভারতীয় আরেক তরুণ দম্পতিও উঠেছেন।

বাগি যখন ছাড়বে, তখন সে বাচ্চা হঠাৎ বায়না ধরলো যে বাগি গাড়ির চাবি নিয়ে সে খেলবে। যথারীতি হসপিটালিটিতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত গাড়ির ড্রাইভার তাকে কোলে বসিয়ে তার হাতে চাবি দিয়ে দিলো। সে মনের আনন্দে চাবি নিয়ে খেলা শুরু করলো আর তার মা পেছনের সিটে বসে তার মেধাবী পুত্রের চাবিখেলার অপার প্রতিভা দেখে আনন্দে গদগদ হয়ে নানা রকম উৎসাহব্যঞ্জক দুর্বোধ্য আওয়াজ আর হাততালি দিতে থাকলো। এক পর্যায়ে গুণধর পুত্রের বাবাও পুত্রকে বাহবা দিয়ে ওদের হিন্দুস্তানি ভাষায় হাট টিমাটিম টিম টাইপের ছড়া বলা শুরু করলো। আমি দর্শকও না, পার্টিসিপ্যান্টও না, আমি থেমে থাকা গাড়ির ড্রাইভারের পাশের সিটে কাকভেজা হয়ে বসে বসে সার্কাস দেখছি। আমার মেজাজ তখন দ্রুত গরম হতে শুরু করছে। কিন্তু সেদিকে বাবা বা মা কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। ড্রাইভার ব্যাটা বাংলাদেশি, সেও দেখলাম এই বিচ্ছু ছেলের গুণে চরম মুগ্ধ। তার স্বদেশি ভাইজান যে ভেজা জামাকাপড় পরে বসে আছে সেদিকে তার কোনো মনোযোগ নেই। উল্টা ব্যাটা বাঙাল ছেলের মাকে বলছে,

Your son will become a pilot in the future.

এমন কমপ্লিমেন্ট পেয়ে পুত্রের মা তো পারলে ড্রাইভারকে এখনই হাতে রাখি পরিয়ে দেয়। ছেলের বাবাকে দেখলাম খুশিতে ড্রাইভারের সঙ্গে কৃতজ্ঞতায় করমর্দন করলো। মনে হচ্ছিল যেন পুত্রের আকিকা অনুষ্ঠান চলছে আর আমি সে অনুষ্ঠানের একমাত্র অনিমন্ত্রিত অতিথি। পুত্রকে দেখলাম এবার চাবিটা তার মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে মুখ বন্ধ করে দিয়েছে আর তার বন্ধ ঠোঁট থেকে চাবির মাছমার্কা কি রিংটা ঝুলছে। আমার মেজাজ তখন আরো গরম হয়েছে। আমি আমার বডি ল্যাংগুয়েজে সেটা কেমন করে যেন খুব সফলভাবে প্রকাশ করে ফেললাম। দেখলাম অর্ধেক কাজ হলো, অর্থাৎ ড্রাইভার পুত্রধনকে তার কোলে বসিয়ে গাড়ি চালাতে শুরু করলো; কিন্তু কয়েক গজ যেতে না যেতেই পুত্রধন বিকট চিৎকার শুরু করে দিলো। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, এই সামান্য দুই ফুটের একটা বাচ্চার ভোকাল কর্ড থেকে এ গগনবিদারী চিৎকার কী করে বের হতে পারে। যা বোঝা গেলো চাবি গাড়ির কি হোলে ঢোকালে হবে না, চাবি ঢোকাতে হবে তার মুখে। অগত্যা এই আহ্লাদিত ড্রাইভার আবার গাড়ি থামিয়ে চাবিটা ছেলেটিকে দিয়ে দিলো আর আমি গাড়ি থেকে নেমে অন্য গাড়ির খোঁজে হাঁটা শুরু করলাম। ততোক্ষণে রাগে আমার ভেজা কানের ভেতর থেকে বাষ্প বের হচ্ছে। ইচ্ছা হচ্ছিল পুঁচকের পাছায় লুকিয়ে একটা রাম চিমটি দিই; কিন্তু পুঁচকের বাবার তাগড়া উত্তর ভারতীয় খাঁটি আর্য, শরীরের সাইজ আর বুকের ছাতি দেখে সে ঝুঁকি নিলাম না। শেষবারের মতো যখন তাকালাম, তখন দেখলাম সৃজনশীল গুণধর পুত্রটি এবার তার মুখ থেকে চাবি বের করে সেই লালাভেজা চাবি এবার ড্রাইভারের মুখে ঢুকিয়ে চাবিখেলার অন্য একটি নতুন সংস্করণ বের করার চেষ্টা করছে। বাঙাল ড্রাইভার যতোই হসপিটেবল হোক ওই চাবি সে কিছুতেই মুখে ঢোকাতে রাজি হচ্ছে না। ব্যাটা এবার বুঝতে পেরেছে সে খাল কেটে কুমির নয় বরং বেয়ারা টাইগার শার্ক নিয়ে এসেছে। পুত্রের মা-বাবাকে দেখলাম জগতের সব কিছু উপেক্ষা করে অপার মুগ্ধতায় তখনো এক দৃষ্টিতে সন্তানের প্রতিভাদীপ্ত চাবিখেলা দেখছে, আমার মতো এক নিরীহ বাঙালের দুরবস্থার দিকে তাদের মনোযোগ দেওয়ার কোনো সময় নেই।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আমি অন্য বাগিতে চড়ে আমার রুমে ফিরে এলাম। ততোক্ষণে আমার রাগ নেমে গেছে। তবু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, বাচ্চাদের এমন আশকারা দেওয়া কি উচিত? ছোটবেলায় যদি এমন আশকারা দেওয়া হয়, তাহলে বড়ো হলে এটা কি আরো বড়ো পরিসরে তার মনস্তত্ত্বের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে না? সে কি আশপাশের মানুষের জন্য অপকারী এমন বায়নাকেন্দ্রিক ক্ষতিকর মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। আমরা কি আদরের নামে, ভালোবাসার নামে অনেক শিশুরই এমন ক্ষতি করছি না? তাদের অসামাজিক করে তুলছি না? আজ এ বয়সে এসে আমার তো মনে হয়, আমাদের মা-বাবারা আমাদের বাল্যকালে যেসব কড়া শাসন করতেন, বকাঝকা করতেন তার মধ্যেই অনেক বেশি প্রকৃত ভালোবাসা নিহিত ছিল। তাঁরা মাঝে মধ্যে আমাদের পিঠে বা পশ্চাৎদেশে যে হালকা মারধর করতেন তার মধ্যে আশীর্বাদ, শিক্ষা আর স্নেহ ছিল অনেক বেশি।

মাহফুজুল হক জগলুল

কান্দি, শ্রীলঙ্কা

৭ অক্টোবর, ২০২২
(লেখায় ব্যবহৃত ছবির সাথে এ গল্পের কোন সম্পর্ক নেই)

 

আরও পড়ুন