মাহফুজ ভাইকে প্রথম দেখি আজ থেকে ৪৭ বছর আগে ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে প্রবেশের পর। ক্যাডেট কলেজে তাকে পেয়েছি চার বছর আর তারপর বুয়েটে স্থাপত্য বিভাগে পেয়েছি পুরোটা সময়, আর তারও পর মির্জাপুর এক্স-ক্যাডেটস অ্যাসোসিয়েশনের (মেকা) নেতা এবং পরবর্তী সময়ে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পেয়েছি বহু বছর। বুয়েট বা মেকায় সব জায়গায়ই আমি ছিলাম তার ঘনিষ্ঠ সাগরেদ। ক্যাডেট কলেজে তিনি ছিলেন চুপচাপ সিনিয়র। ক্যাডেট কলেজে জুনিয়রদের ওপর সিনিয়রদের সীমাহীন ক্ষমতা, শুধু প্রহার করা ছাড়া হেন কোনো অত্যাচার নেই, যা সিনিয়ররা করার অধিকার রাখতেন না। একজন জুনিয়রের জীবন শারীরিক ও মানসিকভাবে আক্ষরিক অর্থেই চরমতম দুর্বিষহ করে দেওয়ার জন্য একজন বিটকেলে স্বভাবের সিনিয়রই যথেষ্ট ছিল। আর প্রায় প্রতি ক্লাসেই গুটিকয়েক এমন বিটকেল সিনিয়র থাকতেন, যারা জুনিয়রদের জ্বালিয়ে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পেতেন। কিন্তু মাহফুজ ভাই সেই দলে ছিলেন না। সবার সঙ্গেই তার ছিল মিষ্টি সম্পর্ক। তাই জুনিয়ররা তাকে খুব পছন্দ করতো।
বুয়েটে তাকে পেয়েছি গুরু হিসেবে। তিনি ছিলেন জাসদ ছাত্রলীগের টগবগে কিন্তু ধীরস্থির মস্তিষ্কের অধিকারী বিপ্লবী ও মেধাবী গুরু। তিনি ছিলেন বুয়েট জাসদ ছাত্রলীগের অন্যতম প্রধান নেতা ও তাত্ত্বিক, আবার কেন্দ্রীয় জাসদ ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক। সেই অর্থে তিনি ছিলেন নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জাতীয় পর্যায়ের সক্রিয় ছাত্রনেতা। কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক হওয়ার কারণে সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলার জন্য পোস্টার ডিজাইন বা ছাপার তদারকি তার করতে হতো। তার সাগরেদ হওয়ার কারণে মফস্বলের অনেক এলাকার কিছু পোস্টার আমাকেও তিনি ডিজাইন করতে দিতেন। তখন এমন কম্পিউটারের চল ছিল না, গ্রাফিকস জিনিসটা তখন খুব কষ্টকর ও ক্লান্তিকর কাজ ছিল৷ পুরো ডিজাইন ও লেখা নিজের হাতে ট্রেসিং পেপারের ওপর ডিজাইন করতাম, ভুল হলে ব্লেড দিয়ে ঘষে তা উঠিয়ে আবার করতাম। এখনকার প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সেসব শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়ার কথা বুঝবে বলে মনে হয় না। তবে আমার যে পোস্টার ডিজাইন করতে ৩/৪ দিন লাগতো, মাহফুজ ভাই তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সাঁই সাঁই করে এঁকে ফেলতেন। নিখুঁত গ্রাফিকস আর বড়ো বড়ো অক্ষরে অতি দ্রুত চমৎকার বাংলা লেখায় তিনি ছিলেন প্রায় জাদুকরতুল্য।
উনার বড়ো ভাই মাহবুব ভাইও মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে আমার সিনিয়র ছিলেন। ক্যাডেট কলেজে উনার ও উনার ক্লাসমেট ড. ম. তামিমের তত্ত্বাবধানে স্টেজ ডেকোরেশনের কাজও করেছি। মাহবুব ভাইও স্থাপত্যের ছাত্র এবং পরে শিক্ষক ছিলেন (বর্তমানে আহছানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি)।
মাহফুজ ভাই খুব দ্রুত সুন্দর ‘চিকা’ মারতে পারতেন। ‘চিকা মারা’ মানে এ প্রজন্মের অনেকে হয়তো বুঝবে না, দেয়ালে রাজনৈতিক স্লোগান লেখাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে বলা হতো ‘চিকা মারা’। মাহফুজ ভাইয়ের কাছেই বুয়েটের বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে ও মেক্যানিকাল বিল্ডিংয়ের দোতলার সানশেডে বিপজ্জনকভাবে রঙের বালতি আর ব্রাশ হাতে দাঁড়িয়ে লাল ইটের দেয়ালে ও ক্যাফেটেরিয়া প্রাঙ্গণে বা পলাশী এলাকায় জীবনে প্রথম চিকা মারা শিখি। রাত ২টা-৩টার দিকে একদম নিঝুম রাতে আমরা চিকা মারতে বের হতাম। আমাদের দলে আরো থাকতেন স্থপতি শাহিনুল ইসলাম ইতি ভাই (পরবর্তী সময়ে সিডিএর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ) আর বন্ধু স্থপতি হাবিব (ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম স্ট্যান্ড করা তুখোড় ছাত্র, বর্তমানে বেলজিয়াম প্রবাসী)। চিকার কিছু নমুনা বাক্য এখানে দিলাম,
‘শ্বেত বেরিকেড ভেঙে ফেলে লাল বেরিকেড গড়ে তোল’
‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’
‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও, লড়াই কর’
‘ওয়ার্ড ব্যাংক ও অইএমএফের সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও’
‘দেশ শাসনে কৃষকের / শ্রমিকের / পেশাজীবীদের অধিকার দিতে হবে’
এই সব নানা রকমের প্রচণ্ড বিপ্লবী বাক্য ২’/৩’ উচ্চতাবিশিষ্ট অক্ষরে আমরা সাদা আর লাল রং দিয়ে লিখতাম। একবার আমার মাথায় একটা আইডিয়া এলো, স্থাপত্য ভবনের পূর্ব দিকে কার্ভ ওয়ালের টপে ‘আমরা সশস্ত্র হবো প্রতিটি মৃত্যুতে’, এই লাইনটি লেখার। কিন্তু কীভাবে সম্ভব এই কাজ করা, এতো উঁচুতে দাঁড়িয়ে কীভাবে লিখবো, মাহফুজ ভাইকে আইডিয়াটা বললাম, উনি খুব পছন্দ করলেন আইডিয়াটা।
উনি বললেন, আজ রাতেই লিখবো।
আমি তখনো বুঝতে পারছিলাম না কীভাবে এতো উঁচুতে লেখা সম্ভব। গভীর রাত্রে সাদা প্লাস্টিক পেইন্ট আর মোটা ব্রাশ নিয়ে আমরা হাজির হলাম স্থাপত্য ভবনের ছাদে। তারপর দেখলাম এক অবিশ্বাস্য জাদু, ছাদে দাঁড়িয়ে শরীরকে সম্পূর্ণ নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়ে উল্টো দিক থেকে উনি ধামাধাম লিখে ফেললেন,
‘আমরা সশস্ত্র হবো প্রতিটি মৃত্যুতে’।
নিচে এসে আমরা লেখাটা দেখলাম, গ্রে কংক্রিটের ওপর একদম সঠিক প্রপোরশন ও সাইজে ঝকঝকে সাদা লেখা – সশস্ত্র মৃত্যুর উচ্চকিত আহ্বান। এই ভয়ানক ও সুন্দর কাজ আর কোনো মানুষের পক্ষে করা সম্ভব কি না আমি জানি না। সত্যিই এ কাজে উনি জাদুকর ছিলেন।
বুয়েটে আমাদের যখন স্থাপত্য বিষয়ে ভাবগম্ভীর জটিল পড়াশোনা করার কথা, তখন মাহফুজ ভাই আমাদের স্টাডি সার্কেলে মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এই সব পড়াচ্ছেন। একবার মাহফুজ ভাইয়ের সঙ্গে আমি, হাবিব আর স্থাপত্যে আমাদের জুনিয়র স্বপন গেলাম নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিলের শ্রমিকদের মার্ক্সবাদের ক্লাস নিতে। আমরা শিক্ষকদের মতো মাহফুজ ভাইয়ের সঙ্গে টেবিলে শ্রমিকদের দিকে মুখ করে বসলাম আর আমাদের সামনে সমবেত শ্রমিকরা বসলো ছাত্রদের মতো। মাহফুজ ভাই সমবেত শ্রমিকদের অনেক সময় নিয়ে মার্ক্সবাদ ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ শেখালেন। এক পর্যায়ে মাহফুজ ভাই বললেন,
আমরা সমাজের দ্বন্দ্বগুলোকে যেভাবে বিশ্লেষণ করবো, একটি বস্তুর ভেতরের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বকেও একই নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করবো।
তারপর তার সামনের টেবিলে বাড়ি মেরে বললেন,
আমরা এই টেবিলকে যেভাবে বিশ্লেষণ করবো, সমাজকেও অনেকটা একইভাবে বিশ্লেষণ করবো।
এভাবে এক পর্যায়ে লেকচার শেষে উনি এবার শ্রমিকরা কতোটুকু বুঝলো তা বোঝার জন্য একে একে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। এক শ্রমিক নেতাকে প্রশ্ন করতেই সে বললো,
আমি আজকে বুঝলাম, সমাজও যা আর এই কাঠের টেবিলও তা।
এরপর আরো অনেক প্রশ্ন আর উত্তরের পালা চলেছিল, তবে সব কথা আজ আর আমার মনে নেই। শুধু ওই শ্রমিক নেতার উত্তরটা আজও মনে আছে। এরপর আমরা নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জ যাই, সেখানে শহরতলির কাছে একটা গ্রামে, সেখানে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন নিয়ে গোপন মিটিং করে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে মুন্সীগঞ্জ শহরে হরতালের সপক্ষে ঝটিকা জঙ্গি মিছিল বের করি। এরশাদ আমলে এ ধরনের রাজনৈতিক কার্যকলাপ খুবই বিপজ্জনক ছিল, যেকোনো সময় গ্রেফতার ও পুলিশি নির্যাতনের সমূহ আশঙ্কা ছিল। এ ছাড়া এরশাদের লোকজন প্রায়শই এসব মিছিলের ওপর অতর্কিত বোমাবাজি করতো। মিছিলের ওপর ট্রাক পর্যন্ত উঠিয়ে ছাত্রদের নিহত করার রেকর্ডও ছিল এরশাদ সরকারের। সত্যি কথা বলতে গেলে মুন্সীগঞ্জের মতো সম্পূর্ণ অচেনা একটা শহরে যেখানে কোনো কিছুই চিনি না, সেখানে এমন মিছিল করতে আমার খুব ভয় করছিল। বোমার আঘাত বা পুলিশের আক্রমণ শুরু হলে কোন দিকে পালাবো তার তো কিছুই জানি না, তবে মুখে সেটা প্রকাশ করতে লজ্জা পাচ্ছিলাম। কেননা আমাদের কমরেড মাহফুজ ভাই ছিলেন বরাবরই প্রচণ্ড সাহসী একজন মানুষ। এসব ব্যাপারে জীবনে কোনো দিনই আমি তাকে বিন্দুমাত্র ভয় পেতে দেখিনি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমি তো মোটামুটি ভীতু প্রকৃতির মানুষ, আন্দোলন, মিছিল বা পিকেটিংয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণ করলেও মাহফুজ ভাইয়ের মতো অমন নির্ভীক আমি কখনোই ছিলাম না।
আমার ভুল না হয়ে থাকলে বা স্মৃতি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘতকতা না করে থাকলে অন্তত একবারের কথা আমার মনে আছে। খুব সম্ভব ১৯৮৬ সালে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে মারামারির এক পর্যায়ে রেজিস্ট্রি বিল্ডিংয়ের কাছে আমাদের পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়, মাহফুজ ভাই তাদের মধ্যে একজন ছিলেন, সম্ভবত ইটের আঘাতে তার মাথা ফেটে গিয়েছিল। কিন্তু মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়েই মাহফুজ ভাই নির্বিকারভাবে এসে আমাদের সঙ্গে আবার যোগ দেন। এ ছাড়া ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো এক কারণে বুয়েট তাকে বহিষ্কার করেছিল, কিন্তু তিনি এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেন। ড. কামাল হোসেন বিনা ফিতে মাহফুজ ভাইয়ের পক্ষে মামলা লড়েন এবং বিজয়ী হন।
মাহফুজ ভাইয়ের সঙ্গে কতো স্মৃতি, কতো গল্প তা বলে শেষ করা যাবে না। বুয়েট থেকে পাস করার পর আমরা যে যার মতো জীবনসংগ্রামে নেমে পড়ি। আমাদের সময় স্থাপত্য প্রফেশনে এতো কাজ ছিল না। আর্কিটেক্ট কী বস্তু ক্লায়েন্টকে তা বোঝাতে বোঝাতেই ঘাম ঝরে যেতো, যতোই বলি না কেন, ক্লায়েন্ট বলতেন,
ও বুঝছি, আপনি একজন ইঞ্জিনিয়ার।
আমরা তীব্র প্রতিবাদ করতাম, তারপর অনেকক্ষণ বোঝানোর পর পরম জ্ঞানী ক্লায়েন্ট এক পর্যায়ে বলতেন,
ও বুঝছি, বুঝছি, আপনি একজন ‘আর্কিটেকচার’।
আমরা ক্লায়েন্ট ছুটে যাওয়ার ভয়ে আর তর্ক বাড়াতাম না, নিজেকে একজন অসহায় ‘আর্কিটেকচার’ হিসেবে মেনে নিয়েই কথাবার্তা চালিয়ে যেতাম। মাহফুজ ভাইও নিশ্চয়ই এ বিড়ম্বনার মধ্য দিয়ে কিছুদিন গিয়েছিলেন। তারপর হঠাৎ একদিন শুনলাম, মাহফুজ ভাই এই ‘আর্কিটেকচার’ বিড়ম্বনার জীবন বাদ দিয়ে ফরেন সার্ভিসে জয়েন করেছেন। এরপর শুনেছি তিনি বার্মা, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করে সর্বশেষ পোল্যান্ডে মাননীয় রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন প্রচণ্ড মার্কিন ও পাকিস্তানি নীতি বিরোধী মানুষ। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, ওই সব দেশে দায়িত্ব পালনকালে এ ব্যাপারে তার নিজের ‘অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব’ কীভাবে তিনি মোকাবেলা করেছিলেন। অবসর নেওয়ার পর তিনি আবার লেখালেখি শুরু করেছেন, আমার বিশ্বাস এ ব্যাপারেও তিনি নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে লিখবেন।
গতকাল ছিল আমার জীবনের বহু স্মৃতির সঙ্গে সংযুক্ত সেই মাহফুজ ভাইয়ের জন্মদিন, পেশাগত কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে গতকাল লেখাটি লিখতে পারিনি। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন মাহফুজ ভাইকে সর্বদা সুস্থ রাখেন, দীর্ঘ ও সুখী জীবন দান করেন এবং তার ও তার পরিবারের সবাইকে ভালো রাখেন।
২১ জুলাই, ২০২২