স্থপতি মোহাম্মদ আলি নকী

বুয়েটে আমি যেহেতু ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম, তাই বরাবরই জুনিয়রদের সঙ্গে আমার প্রায় বন্ধুর মতো সম্পর্ক ছিল সব সময়। নকীরা যখন প্রথম বর্ষের স্থাপত্যের ছাত্র আমরা তখন দ্বিতীয় বর্ষের ‘বড় ভাই’। সত্যি কথা বলতে গেলে নকীর সঙ্গে অন্তরঙ্গতা হওয়ার আগে যেকোনো বিচিত্র কারণেই হোক ওকে আমার কেন যেন তেমন পছন্দ হতো না। একদিন দেখি, নকী কয়েকজনকে নিয়ে ফ্যাকাল্টি থেকে বেরিয়ে ব্যস্তভাবে কোথায় যেন যাচ্ছে। আমাকে দেখে একটু থমকে দাঁড়িয়ে সংকোচহীনভাবে নকী বললো,
চলেন ভাই, আমারা বাসায়, আপনাকে আজ ম্যাজিক দেখাবো।

আমি কিছুটা বিব্রত, কিছুটা অপ্রস্তুত! এ ছেলে কোন কিসিমের ম্যাজিক দেখানোর পরিকল্পনা করছে কে জানে। যে ছেলের সঙ্গে আমার তেমন কোনো খাতিরই হয়নি আর যাকে আমি তেমন পছন্দও করি না সে এমন আন্তরিকতার সঙ্গে আমাকে আমন্ত্রণ জানাবে, সেটা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল। মানুষকে যেমন খারাপ ব্যবহার দিয়ে আঘাত করা যায়, আবার কখনো কখনো নিষ্পাপ ও নিখাদ ভালো ব্যবহার দিয়েও আঘাত করা যায়। নকী দ্বিতীয়টা দিয়ে আঘাত করে প্রথম ধাক্কাতেই আমাকে একেবারে কুপোকাত করে ফেললো। আমি অনেকটা ঘোরের মধ্যে ওর সঙ্গে ম্যাজিক দেখতে চারদিকে উঁচু দেয়ালঘেরা ওর নারিন্দার বিশাল যৌথ পরিবারের বাসায় উপস্থিত হলাম। ওর রুমে গিয়ে দেখি বিছানার ওপর, টেবিলের ওপর, এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা রকমের ম্যাজিকের অনেক পুরোনো বই। নকী বিপুল উৎসাহে আমাকে নানা ধরনের ম্যাজিক দেখালো আর তার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাজিকের বইয়ের ইলাস্ট্রেশন দেখিয়ে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলো, ম্যাজিক আসলে পুরোটাই অনেক প্র্যাকটিস করা হাতের কারসাজি আর Visual Illusion. সেই যে ম্যাজিক দেখেছি, সে ম্যাজিকের ঘোর আমার কেটে গেছে; কিন্তু ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কের ম্যাজিক সেদিন থেকে দিনে দিনে আরো গভীর হয়েছে, যা আজ পর্যন্ত বজায় আছে।

নকী শুধু ম্যাজিকই জানে তা না, ও খুব ভালো বাঁশি বাজায়, অসম্ভব সুন্দর গান গায়, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সংগীতের ওপর লেকচার দেয়। কিছুদিন আগেও ও একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিল। এ ছাড়া আরো অনেক কিছু ও করে, তবে ওর সঙ্গে আমার জমে সবচেয়ে বেশি ইতিহাস, দর্শন ও ধর্ম নিয়ে আলোচনা করে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আমরা এসব নিয়ে আলোচনা করতাম। তর্ক-বির্তক করতাম। পাস করার পরও নকী অনেক রাত থেকেছে আমার বাসায়। সারা রাত আমরা কাটিয়ে দিয়েছি অমন সব আলোচনা আর তর্ক-বিতর্ক করে। বিশেষ করে আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসচর্চার নতুন যে ধারাগুলো শুরু হয়েছে তিন-চার দশক ধরে, যাঁরা নতুনভাবে ও নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপমহাদেশের ইতিহাসকে পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্চিন্তন শুরু করেছেন নকী তাঁদের লেখাকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, এ জন্য আমি নকীর কাছে চির কৃতজ্ঞ। প্রবীর ঘোষের বিখ্যাত বই সিরিজ ‘অলৌকিক নয় লৌকিক’ বা আরজ আলি মাতুব্বরের লেখার সঙ্গেও আমার পরিচয় নকীর মাধ্যমে।

আমরা যখন স্থাপত্যের পঞ্চম বর্ষে তখন আমাদের ডিপার্টমেন্টের রজতজয়ন্তীর দায়িত্ব আসে আমাদের ওপর। তখনকার স্থাপত্য ছাত্রসংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক নকী ছিল আমাদের প্রধান সেনাপতি। খুব সাকসেসফুলি আমরা সে অনুষ্ঠানটি করেছিলাম, যা আজও আমাদের প্রজন্মের সবার মনের মধ্যে গেঁথে আছে।

লেখা লম্বা হয়ে যাচ্ছে, নকীর সব গুণের কথা লিখতে গেলে লেখা আরো অনেক বড়ো হবে, সে কারণে লেখা এখানেই শেষ করছি। আজ আমার প্রিয় ছোট ভাই নকীর জন্মদিন। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন আমার এ ভাইটিকে ও ওর পরিবারের সবাইকে সব সময় ভালো রাখেন, সুস্থ রাখেন, সুখে রাখেন।

১৪ নভেম্বর, ২০২২

আরও পড়ুন