প্রকৌশলী শামিম আহসান মোহিবুল্লাহ

শামিম আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শামিম আমার বন্ধু না হয়ে যদি পীর হতো তাহলেও বোধ হয় খারাপ হতো না। কেননা আমার জীবনে আমি যতো ভালো জিনিস শিখেছি, তার অনেক কিছুই শিখেছি শামিমের কাছ থেকে। আমার জীবনে যখন দুঃখের সময় আসে, তখন শামিমের কাছে যাই। ওর কাছে গেলে কোনো না কোনো একটা পথ খুঁজে পেয়েছি সব সময়। চরম নির্মোহ সংসারবিবাগী এই মানুষটি অন্য সকলের সংসারে সুখ আনার জন্য সর্বস্ব দিতে প্রস্তুত সব সময়। শামিমের মতো বিচিত্র স্বভাবের মানুষ আমি আমার জীবনে খুব কম দেখেছি। ওর গভীর ধার্মিক জীবনাচরণ, প্রচণ্ড মেধাবী ও যুক্তিবাদী মন, প্রখর বিজ্ঞানমনস্কতা, বিনয়ী স্পষ্টবাদিতা, কৌতূহলী পরিব্রাজক জীবন ও পোশাক-আশাকে শতভাগ ফ্যাশনবোধবিমুখতা আর একই সঙ্গে ওর নির্মল, অমায়িক, নিরহংকার ব্যবহার আর প্রচারবিমুখ দানশীলতা আমাকে ওর প্রতি মুগ্ধ করে রেখেছে চল্লিশ বছর ধরে।

দক্ষিণাঞ্চলে গিয়ে গরিবের জন্য হাসপাতাল বানানো; সুন্দরবনের পাশে আইলাবিধ্বস্ত অঞ্চলে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা; জামালপুরের অচেনা গ্রামে গরিবের হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া; গ্রামে গ্রামে নিমগাছ লাগানো; স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট বানিয়ে দেওয়া; আশ্রয়হীনকে ঘর বানিয়ে দেওয়া; গ্রামীণ বিধবাদের নিয়ে ছাগলের প্রকল্প নেওয়াসহ সব কাজেই শামিম আজও আছে কখনো শক্ত সহযোগী হিসেবে, আবার কখনো একা একাই।

নানা বিচিত্র জগতে আমরা বিচরণ করেছি চার দশক ধরে। ওর উপদেশে নিজের আত্মাকে বশে আনার জন্য কোয়ান্টাম মেথডে ‘মনের বাড়ি’ নির্মাণ করে মেডিটেশন চর্চা করেছি। একত্রে মৌন উপবাসব্রত পালন করেছি। যোগ ব্যায়াম করেছি। এলিফ্যান্ট রোডের বাইতুল মামুর মসজিদে রাতে সব লাইট নিভিয়ে অন্ধকারে সদলবলে উচ্চৈঃস্বরে জিকির করেছি। একত্রে কোরান স্টাডি সার্কেলে আলোচনা/তর্ক/বিতর্ক করছি প্রায় টানা ২০ বছর ধরে। মোট কথা, জীবন ও মহাজীবনের যতো ভালো ও কল্যাণকর দিক আছে সেদিকে ও আমাকে টেনে নিতে চেয়েছে সারা জীবন। সে জন্যই বলেছিলাম, ও আমার জন্য যতোটুকু না বন্ধু তার চেয়ে আমার জন্য অনেক বেশি পীর।

আমরা একত্রে দেশে-বিদেশে ঘুরেছি অনেক। ইস্তানবুলে একত্রে সুফিদের দারবিশ নৃত্যে বিভোর হয়ে থেকেছি। কৃষ্ণ সাগরের তীরে ঘুরে বেড়িয়েছি। একাধিকবার একত্রে চীনদেশে ভ্রমণ করেছি। ও যেহেতু চীনা ভাষা খুব ভালো জানে তাই ওর সঙ্গে চীনদেশে ঘোরার মজাই আলাদা। ওর সঙ্গে কথোপকথনের পর আমাকে এক চায়নিজ বলেছে, শামিম ওর চেয়ে অনেক ভালো চায়নিজ জানে। পবিত্র রমজানের সময় আমরা একত্রে মসজিদুল হারামে অবস্থান করে ইহতিকাফ করেছি, ওমরাহ করেছি। একত্রে রাসুল (সা.)-এর রওজা জিয়ারত করেছি। পিরোজপুর, খুলনা, কয়রা, কুষ্টিয়া, বরিশাল, জামালপুর, ইসলামপুর, দুরমুট, কক্সবাজার, চকরিয়া, বাগেরহাট, চুকনগর, শীরামকাঠি, বরুড়া, কুমিল্লাসহ সারা বাংলাদেশের বহু জায়গায় আমরা একত্রে ঘুরে বেড়িয়েছি।
এ ছাড়া ওর আরো অনেক ক্ষেত্র আছে, যেখানে আমি ওর সঙ্গী নই। তার একটা হচ্ছে ওর এস্ট্রোফিজিকস চর্চা আর অবসর সময়ে ওর ক্রিটিক্যাল হাইয়ার ম্যাথম্যাটিকস করে আনন্দ পাওয়া। তবে ওরই উৎসাহেই কোয়ান্টাম ফিজিকসের প্রচণ্ড জটিল আর রহস্যময় জগতে আমি কিছুটা ঢুকতে চেষ্টা করেছি ও আনন্দ পেয়েছি।

ওর মতো বিচিত্র ও বিশাল মাপের মানুষ নিয়ে লিখলে অনেক লেখা যায়। সে কাজ এখানে করছি না। এতোটুকু লেখার একমাত্র কারণ হচ্ছে গতকাল ছিল ওর জন্মদিন। তাই বন্ধুর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতেই সামান্য এইটুকু লিখলাম।

আমি জানি, দেশে ও বিদেশে অসংখ্য মানুষ আছে, যারা সব সময় ওর জন্য দোয়া করে। পরম করুণাময়ের কাছে আমিও তাদের মতো প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমার বন্ধুটিকে আর ওর পরিবারের সবাইকে ভালো রাখেন, সুস্থ রাখেন, সুখে রাখেন।

পরম করুণাময়ের কাছে আরো একটি প্রার্থনা ছিল, সেটা হচ্ছে আমাদের দুজনের অনেক দিনের স্বপ্ন হলো একত্রে মস্কো থেকে ট্রান্স-সাইবেরিয়ার রেলওয়েতে প্রায় ১০ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ভ্লাডিভস্টক যাওয়া। আশা করি, করুণাময় আমাদের এ প্রার্থনাটাও একদিন পূরণ করবেন।

১৩ অক্টোবর, ২০২২

আরও পড়ুন