পাগলা চা

১৯৪৭ সালে তিন দিকে আটকানো পদ্মা, মেঘনা আর যমুনা বিধৌত একটা অতিক্ষুদ্র জলকাদায় অর্ধনিমজ্জিত বদ্বীপের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষকে ঠেলেঠুলে জোর করে ভরে দেওয়া হয়েছিল। তখনকার পূর্ব পাকিস্তান ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সে কারণেই হয়েছে এ গ্রহের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ। পূর্ব বাংলার কৃষকের শ্রম নিষিক্ত সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়ে গড়ে উঠেছিল কলকাতা শহর, যা আমরা হারিয়েছি সে সময়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ বঙ্গবন্ধুর মতো নেতারাও কেউই বিশ্বাস করতে পারেননি যে কলকাতা আমাদের হারাতে হবে। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে সে কথা আক্ষেপ করেই তিনি লিখেছেন,

‘শহীদ সাহেবের (সোহরাওয়ার্দী) পক্ষ থেকে বাংলা সরকারের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী ঘোষণা করেছিলেন, কলকাতা আমাদের রাজধানী থাকবে। দিল্লি বসে অনেক পূর্বেই যে কলকাতাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে একথা আমরা জানতামও না, আর বুঝতামও না। তখনকার প্রিন্সলি স্টেট ত্রিপুরার রাজপরিবার চেয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে; কিন্তু তখনকার মুসলিম লীগ নেতাদের অবহেলা ও অদূরদর্শিতার কারণে সেটা বাস্তব রূপ পায়নি। সে কারণে ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও দুই বছরেরও বেশি সময় পর ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে ত্রিপুরা ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়। একইভাবে ত্রিপুরা, আসাম আর আরাকানও আমরা হারিয়েছি। বর্তমানে আবার উল্টো আরাকান থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে জোর করে ধরে আমাদের এই ছোট্ট ভূখণ্ডের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, আবার অন্যদিকে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকেও নতুনভাবে ঠেলে দিতে চাচ্ছে অনেককে।

তবে এতো অন্যায়-অবিচারের পরও পূর্ববঙ্গের কৃষকের সন্তান সেই বাঙালিদের ‘কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি’, আজ তারা ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর আনাচকানাচে । মানুষকে জোর করে চেপে ভরে দিলেই হবে না, প্রকৃতি তার আপন নিয়মেই অগ্রসর হবে আর মনে রাখতে হবে, মানবজাতির ইতিহাস প্রধানত মাইগ্রেশনেরই ইতিহাস। ইতিহাস তার অমোঘ আপন গতিতেই চলবে আর সে কারণেই প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি আজ প্রবাসী হয়েছে , ইউরোপসহ পৃথিবীর বহু গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী দেশের জনসংখ্যাও এর চেয়ে অনেক কম।

এমনি কিছু বাংলাদেশি আছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে। গত রাতে দেশি খাবারের জন্য ব্যাংককের সুকুমভিতের সয় ১১-তে গিয়ে দেখতে পেলাম এমনই বাংলাদেশি চা আর স্ন্যাকসের সুন্দর একটা স্টল। অ্যাম্বাসাডর হোটেলের বিশাল প্লাজার সামনে অবস্থিত এই স্টলের নাম দিয়েছেন তারা ‘পাগলা চা’। এমন অভিনব নামে চারদিকে সাড়া পড়ে গেছে। বাংলাদেশিসহ ইউরোপ, আমেরিকার বহু উৎসুক পর্যটক লাইন ধরে এখানে চা আর স্ন্যাকস খাচ্ছে। জীবনে প্রথম এমন হালাল মার্কযুক্ত চায়ের দোকান দেখলাম। নব নব এমনই উদ্ভাবনীশক্তি আর সামর্থ্য নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এগিয়ে যাক এবং সারা পৃথিবীতে আমাদের চিহ্ন ছড়িয়ে দিক, এ কামনাই করি সব সময়।

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২

 

আরও পড়ুন