ছবিতে মানুষটিকে যতো বয়স্ক মনে হচ্ছে আসলে মানুষটি কিন্তু এতোটা বয়স্ক নন। মানুষটি প্রখ্যাত স্ট্রাকচারাল ডিজাইনার শামসুল আলম বিটু ভাই। আমাদের অনেকেরই প্রিয় বিটু ভাই। বাংলাদেশের স্ট্রাকচারাল ডিজাইনাররা একসময় খুব উন্নাসিক ছিলেন, স্থপতিদের সব স্বপ্নকেই তাঁরা নিরেট অবাস্তব মনে করতেন আর রাগী ধমক এবং সোজাসাপটা লাইন টেনে দিয়ে স্বপ্নগুলোকে একদম অঙ্কুরেই খতম করে দিতেন। ভালো গান লেখার জন্য যেমন গীতিকার আর সুরকারের মধ্যে মনের মিল থাকা উচিত, একজনের ওপর আরেকজনের শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত, তেমনি স্থপতি আর স্ট্রাকচারাল ডিজাইনারের মধ্যেও মনের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মিল আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা খুব দরকার। এ ছাড়া কখনোই ভালো কোনো সৃষ্টি সম্ভব হয় না।
প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশের যে কজন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার স্থপতিদের সৃষ্টিশীলতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে স্থপতিদের সম্ভব-অসম্ভব সব স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন বিটু ভাই তাঁদের মধ্যে একদম প্রথম কাতারের। আশির দশকে করা আমার বাবার উত্তরার চারতলা বাড়িটিই খুব সম্ভবত বিটু ভাইয়ের একদম প্রথম দিকের কাজ। বাড়িটির স্থপতি ছিলেন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান স্থপতি কাজি নাসির ভাই। দুজনের মধ্যে ছাত্রজীবন থেকেই গভীর বন্ধুত্ব। আজও চোখ বুজলেই দেখতে পাই আমাদের গুলশানের বাসার ড্রয়িংরুমের লাল রঙের বিশাল কার্পেটের ওপর ল্যাটকা মেরে বসে আমার বাবা, নাসির ভাই আর বিটু ভাই রাতের পর রাত বড়ো বড়ো ড্রয়িং শিট বিছিয়ে আলোচনা করছেন আর আমার মা কিছু সময় পর পর চা-নাশতা নিয়ে এসে তাদের সঙ্গে আলোচনায় যোগ দিচ্ছেন আর কিচেনের সাইজ ঠিক আছে কি না তা নিয়ে চাপাচাপি করছেন। এ ঘটনা যখন বলছি তখন আমি মাত্র বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের প্রথম বর্ষের নাদান ছাত্র।
এরপর কয়েক দশক পেরিয়ে গেছে, বিটু ভাই আজ বাংলাদেশের প্রখ্যাত স্ট্রাকচারাল ডিজাইনার, এক নামে সবাই তাঁকে চেনে। আজ আমিও আমার ডিজাইনের সম্ভব-অসম্ভব সব স্বপ্ন নিয়ে বিটু ভাইকে জ্বালাতন করি। বিটু ভাই হাসিমুখে আমার সব জ্বালাতন সহ্য করেন আর আপ্রাণ চেষ্টা করেন মাধ্যাকর্ষণ বলকে সৃজনশীল গাণিতিক সৌকর্যের মাধ্যমে বশে এনে আমার স্থাপত্যিক স্বপ্নগুলোকে কংক্রিটের অবয়বে বাস্তবে রূপ দিতে।
এ বয়সেও প্রচুর কাজ করেন তিনি আর উপার্জনও করেন অনেক; কিন্তু আমি যতোটুকু জানি তাঁর উপার্জনের বেশির ভাগই তিনি ব্যয় করেন হতদরিদ্র মানুষের জন্য। এমন বিশাল মনের মানুষ আমার জীবনে আমি খুব কম দেখেছি। পেশাগত সম্পর্কের বাইরেও বিটু ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আপন বড়ো ভাইয়ের মতো। পেশা জগতের বাইরে আমরা অন্য জগতেও একত্রে সামান্য কিছু কাজ করি। তাই আমাদের মধ্যে দৈনন্দিন যোগাযোগ অনেক বেশি। গতকাল ছিল আমার এই প্রিয় বড়ো ভাইটির জন্মদিন, পরম করুণায়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমার ভাইটিকে খুব ভালো রাখেন, সুখে রাখেন, তাঁকে দীর্ঘ পুণ্যময় জীবন দান করেন এবং তাঁর পরিবারের সবাইকে ভালো রাখেন।