আলগ্রেভের লাইমস্টোন গুহা আর বড়লেখার শক্তিধর

এবারের ইউরোপ সফরের এক পর্যায়ে আমরা ছজন স্থপতি লিসবন থেকে গত মাসে গিয়েছিলাম পর্তুগালের একদম দক্ষিণে অবস্থিত আলগ্রেভে। লিসবন থেকে সড়কপথে আলগ্রেভ মোটামুটি ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণে। ভূমধ্যসাগর জিব্রাল্টার প্রণালি পার হয়ে যেখানে আটলান্টিকের সঙ্গে মিশেছে, সেখানে আটলান্টিক অনেকটা উপসাগরের আকার ধারণ করেছে। আলগ্রেভের লম্বা প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পারের পুরো দক্ষিণ জুড়েই আটলান্টিকের এই উপসাগরের মতো বিশাল জলরাশি আর তারও দক্ষিণে সোজা উত্তর আফ্রিকার রহস্যময় মরক্কো উপকূল।

লিসবনে সকালের নাশতা সেরে মাঝারি সাইজের একটা মাইক্রোবাসে আমরা ছজন রওনা দিলাম অজানা আলগ্রেভের উদ্দেশ্যে, সঙ্গে আমাদের গাইড কাম গাড়িচালক, যে সব ব্যাপারেই চরম উৎসাহী সিলেটের বড়লেখা নিবাসী ও পর্তুগাল প্রবাসী টগবগে যুবক শক্তিধর। কারো বাড়ি সিলেট শুনলেই অটোমেটিক আমার মুখ থেকে একটা প্রশ্ন চট করে বেরিয়ে আসে, সেটা হচ্ছে,

শাকুর মজিদকে চেনেন?

যথারীতি শক্তিধরকেও তা জিজ্ঞেস করলাম। শক্তিধর বললো, সে শাকুরকে চেনে না। কেননা বহু বছর সে দেশের বাইরে, উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করলো,

তাইন কি মিনিস্টার?

আমি বললাম,

না, এখনো মিনিস্টার হয় নাই। তবে ভবিষ্যতে মিনিস্টার হবার জোরালো সম্ভাবনা আছে।

ও বললো,

ভালা, ভালা।

তারপর একদম ননস্টপ নানা রকম প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় গল্প শোনাতে শোনাতে শক্তিধর ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই আমাদের আলগ্রেভ পৌঁছে দিলো। এখানকার জায়গার নামগুলো, যেমন আলগ্রেভ বা আলবুফারা শুনলেই এসব অঞ্চলের সঙ্গে এককালের আরবীয় সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আন্দাজ করা যায়। কেননা এখান থেকে জিব্রাল্টার মোটামুটি মাত্র ২৮০ কিলোমিটার দূরে, যেখানে ৭১১ সালে মুসলিম সেনাপতি তারেক মাত্র ৭০০০ সৈন্য নিয়ে স্পেন বিজয়ের ঐতিহাসিক সূচনা করেছিলেন। এর ফলে তখন থেকে স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল ৭০০-৭৫০ বছর মুসলমানদের শাসনাধীন ছিল। সেই থেকে ওই পাহাড়ি এলাকার নাম হয়ে যায় তারেকের পাহাড়, আরবিতে ‘জাবাল আল তারিক’ (আরবিতে জাবাল অর্থ পাহাড়)। উন্নাসিক ব্রিটিশরা যেহেতু যেকোনো জায়গা বা ব্যক্তির নাম বিকৃত করায় মহা ওস্তাদ আর বিশ্বব্যাপী তাদের সেই বিকৃত নাম সগর্বে অনুসরণ করার জন্য ‘নেটিভ এলিট’ চাটুকারদেরও কোনো দেশে আর কোনো কালেই অভাব ছিল না, সে জন্য যেভাবে ঢাকাকে তারা ডেক্কা বানিয়েছিল, কলকাতাকে বানিয়েছিল ক্যালকাটা, মুসা আল বায়েককে যেমন আজও মোজাম্বিক বানিয়ে রেখেছে, তেমনি জাবাল আল তারিককে নির্দ্বিধায় বানিয়ে নিয়েছে জিব্রাল্টার। তেমনিভাবেই আলগ্রেভ নামটিও এসেছে আরবি ‘গারব আল আন্দালুস’ অর্থাৎ আন্দালুসিয়ার পশ্চিমের অঞ্চল কথাটি থেকে।

আলগ্রেভের এক উঁচু মালভূমির মতো প্রাচীন সুন্দর একটি শহরের ভেতরের সরু কিন্তু অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও নিপাট অনেক কালো কোবাল্ট পাথর বসানো গলির ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে গাড়ি এসে থামলো এক জায়গায়। আমরা গাড়ি থেকে নেমে একটু এগিয়ে যেতেই সবাই একদম বাকহারা হয়ে গেলাম। সামনে হঠাৎ করে দেখা দিলো আটলান্টিকের অন্তহীন নীল উত্তাল জলরাশি। আমরা তখন দাঁড়িয়ে আছি সমুদ্র থেকে বেশ কয়েকশ ফুট উঁচুতে। নিচে বিশাল সমুদ্রসৈকতে হাজার হাজার মানুষ শুয়ে আছে। জায়গাটা আটলান্টিকের পারে হলেও চারদিকের আবহ ও আবহাওয়া পুরোপুরি ভূমধ্যসাগরীয় চরিত্রের আর গ্রীষ্মের সূর্যের তেজও ঠিক তেমন। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ মানুষ এ সময়ে সমুদ্রসৈকতে তাদের গায়ের চামড়া ট্যান করার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে সাগরপারের এই সূর্যালোকের জন্য, বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া তাদের সবচেয়ে প্রিয়। এতো ওপর থেকে বহু নিচের সৈকতের মানুষগুলোকে মনে হচ্ছিল যেন ক্ষুদ্র ঝাঁক ঝাঁক রঙিন পুতুল। সৈকতের পেছনেই বহু দূরে লাইমস্টোনের খাড়া পার দেখা যাচ্ছে আর দেখা যাচ্ছে নানা বিচিত্র ডিজাইনের রিসোর্ট আর হলিডে কটেজ। সব মিলিয়ে এক অভাবনীয় সুন্দর প্রাণবন্ত পরিবেশ। এতো ওপর থেকে সাগর দেখা নিশ্চয়ই খুব আনন্দের; কিন্তু মানুষের সহজাত প্রবণতা হলো সাগরের কাছে গিয়ে সাগরের পানিতে নিজের পা ভেজানো। তাই এই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রাথমিক বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে নেবার পর পরই আমরা ঠিক করলাম নিচে সৈকতের দিকে যাবো। কিন্তু এতো নিচে যাবো কী করে, তবে একটু পরেই দেখতে পেলাম একের পর এক ধাপে ধাপে এসকেলেটর দিয়ে সবাই নিচের দিকে যাচ্ছে। আমরাও একে একে তাদের অনুসরণ করলাম। আসলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত কোনো এলাকা বা অঞ্চলকে সঠিক অবকাঠামো দিয়ে একটি সার্বিক পরিকল্পনার মধ্যে না আনলে কোনো এলাকাই পর্যটনবান্ধব হয় না।

এতো সুন্দর সুন্দর স্পট থাকার পরও বাংলাদেশ এ কারণেই দেশীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য পর্যটনবান্ধব কোনো গন্তব্য হয়ে উঠতে পারেনি আজ পর্যন্ত। আলগ্রেভে এ দুটোই সমানভাবে উপস্থিত, যেমন এর অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর তেমনি উপস্থিত এর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সার্বিক যথাযথ বাস্তবসম্মত মাস্টারপ্ল্যান ও চারদিকের আধুনিক রিসোর্ট স্থাপত্য ও পুরোনো স্থাপত্যের কনজারভেশন পরিকল্পনা এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন। সব কিছু মিলিয়ে যেকোনো পরিমাপেই সত্যিই এটা একটা সম্মিলিত পর্যটন সুবিধাসম্পন্ন মাস্টারপিস।

নিচে নেমে আমরা ‘Algrave cave and Dolphin watching tour’-এর জন্য টিকিট কাটার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পর্যটকের এতো ভিড় যে ছয়জনের জন্য টিকিট পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য বলে মনে হলো। দলের মধ্যে যারা আমার চেয়ে অনেক করিতকর্মা তারা ট্যুর টিকিট জোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো আর আমি এই ফাঁকে একটু এদিক-সেদিক ঘুরতে লাগলাম। ঘুরতে ঘুরতে প্লাজার ওপরের অস্থায়ী দোকানে বসে থাকা এক জিপসি বৃদ্ধার প্রতি আমার চোখ আটকে গেলো। কেন চোখ আটকে গেলো আমি তা জানি না, তবে তার চোখের মধ্যে কেমন যেন একটা অপার্থিব জ্যোতি ছিল। শুনেছি জিপসিরা মানুষের মধ্যে হিপনোটিজম বা suggestive induced hallucination তৈরি করে অনেক কিছু করিয়ে নিতে পারে। আমাকে সেই জিপসি বৃদ্ধা সে জাতীয় কিছু করেছিল কি না জানি না, তবে অনেকটা বিনা প্রস্তুতিতেই অল্পক্ষণের মধ্যেই আমি তার স্টল থেকে অনেকগুলো ভীষণ অদ্ভুত ডিজাইনের মালা, নেকলেস আর মোটা মোটা অদ্ভুতদর্শন চুড়ি কিনে ফেলি।

দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে দেশে এসে অবশ্য এ মালা আর চুড়িগুলো আমার স্ত্রীকে ঠাণ্ডা রাখতে আমাকে বেশ সাহায্য করেছে। সে জন্য দেশে এসে নিজের অজান্তেই ওই জিপসি বৃদ্ধাকে ধন্যবাদ জানাই। তবে তার অপার্থিব দৃষ্টির কথা মনে এলে আমি এখনো কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করি। অন্যদিকে ততোক্ষণে আমাদের ক্রুজের টিকিট জোগাড় হয়ে গেছে। আর তখন খুব অল্প সময়ের মধ্যে লাঞ্চ করে যেতে হবে ক্রুজের জন্য নির্ধারিত পোতাশ্রয়ে, যা কি না ওখান থেকে কয়েক মাইল দূরে।

শক্তিধর ততোক্ষণে তার গাড়ি পার্ক করে ভিড়ের মধ্যে কেমন করে যেন আমাদের খুঁজে বের করে তার ননস্টপ কথার মেশিন আবার পূর্ণোদ্যমে চালু করে দিয়েছে। তবে ততোক্ষণে আমরাও তার এ জিনিসে অনেকটা অভ্যস্ত হতে শুরু করেছি। কাছেই তাড়াহুড়ো করে এক পর্তুগিজ রেস্টুরেন্টের খোলা চত্বরে আমরা খেতে বসলাম। রেস্টুরেন্টের ওয়েটাররা ছিল নেপালি, তাই ভাঙা ভাঙা কানাখোঁড়া হিন্দিতে আমরা আমাদের খাবারের অর্ডার দিতে চেষ্টা করছিলাম, নেপালিরা বললো,

এখানকার লোকাল ডেলিকেসি ফিশ স্যুপ অর্ডার দাও।

প্রচণ্ড রোদে এতোক্ষণ হেঁটেছি, পেটে দুনিয়ার ক্ষুধা, সামান্য একটা স্যুপে কী আমার মতো নিখাদ বাঙালের পেট ভরবে? এর আগে কয়েকবার ইন্ডিয়ান দাদাদের কথামতো খাবার অর্ডার দিয়ে চরম ধরা খেয়েছি। তাই ঘর পোড়া গরুর মতো সব সাজেশন দাতাকেই সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছি। তবে এরা তো নেপালি, ভাবলাম দেখি একটা চান্স নিয়ে। তাই নেপালি ভাইজানদের কথামতো ‘লোকাল ডেলিকেসি’ অর্ডার দিলাম সবাই। ভাবলাম দেখি আর একবার, ডেলিকেসি না হিপোক্রেসি (শুধু একজন বাদে, সে আবার মাছের গন্ধ সহ্য করতে পারে না)। যথাসময়ে বিরাট বিরাট বাটিতে গরম গরম ঘন ফিশ স্যুপ এলো। আহা, কী ফ্লেভার, কী সুন্দর স্বাদ! ঘন স্যুপ আর নানা প্রকারের ভেষজ আর হালকা মসলার মধ্যে সাদা সাদা অর্ধগলিত সামুদ্রিক মাছের টুকরা ভেসে বেড়াচ্ছে। লোকাল ডেলিকেসিতে সত্যিই আমাদের পেটও ভরলো আর মনও ভরলো। ব্রিটিশ আর্মিতে এখনো নেপালি গুর্খা রেজিমেন্ট আছে বলে শুনেছি। কেননা এরা কখনো এদিক-সেদিক করে না, চরম অনুগত আর এককথার মানুষ এরা। স্যুপ খেয়ে দেখলাম, আসলেই নেপালি ভাইজানদের সাজেশন শতভাগ সঠিক, কোনো রকম এদিক-সেদিক নেই। মটর পনির, পালক পনির, আন্ডা পনির বলে বলে দাদাদের মতো একই বদখত বস্তু নানা নামে বারবার সার্ভ করার ধান্দা এদের মধ্যে নেই। তাই খুশিমনে নেপালি ভাইজানদের বখশিশ আর অনেক ধন্যবাদ দিয়ে আমরা দ্রুত ছুটলাম পোতাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে।

পোতাশ্রয়ে পৌঁছে দেখি শত শত ছোট ইয়াট অপেক্ষা করছে ট্যুরিস্টদের জন্য, আগে যে আমাদের ধারণা দেওয়া হয়েছিল টিকিটের খুব সংকট, তা আসলে একদমই সঠিক না। যাই হোক, যথাসময়ে আমাদের ইয়াট ছাড়লো। আমরা সবাই খোলা ডেকে সারি সারি ফিক্সড চেয়ারের ওপর বসলাম আর আমাদের ইয়াট অনিন্দ্যসুন্দর পোতাশ্রয় ছেড়ে আস্তে আস্তে আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে অগ্রসর হতে থাকলো। দেখা গেলো, এক তরুণী আর এক লম্বা সুদর্শন দাড়িওয়ালা তরুণ আমাদের গাইড, যারা পর্তুগিজ আর ইংরেজি এ দুই ভাষায় আমাদের নানা রকম বর্ণনা দিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আটলান্টিকের খোলা জলে ভীষণ জোরে চলতে শুরু করলো আমাদের ইয়াট, আটলান্টিকের ঢেউয়ে দুলে দুলে উঠছে আমাদের ইয়াট। দাঁড়ানো তো সম্ভবই না, বসে থাকাই কষ্টকর। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য হলাম যে আমাদের ইয়াটের নানা দেশের ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন যাত্রীর কাউকেই কোনো লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হলো না। খোদ ইউরোপের মধ্যে আটলান্টিকের ঢেউয়ে উথাল-পাতাল এই তীব্র বেগে ছুটে চলা একটা ছোট্ট নৌযানের যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট না পরিয়েই যাত্রা শুরু, এটা কল্পনা করতেও আমার আশ্চর্য লাগছিল। বাংলাদেশে পদ্মা পাড়ি দিয়ে মাওয়া থেকে চর জানাজাত যেতে হলেও স্পিড বোটে সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরানো হয়। আসলে আমার মনে হয়েছে, ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় পর্তুগিজরা অনেক বেশি ঢিলেঢালা, যাকে বলে একটু ‘লুজ টাইপ’ আর কি।

 

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের দাঁড়াবার পারমিশন দেওয়া হলো। আমরা সবাই ইয়াটের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালাম। তবে গাইড তরুণী বললো যে সব সময় ডলফিনদের মুড ভালো থাকে না, তাই সব যাত্রায়ই যে ডলফিন দেখা যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভাগ্য ভালো থাকলে হয়তো আমরা ডলফিনের দেখা পাবো আর না হলে না। তবে বলতেই হবে, আমাদের ভাগ্য খুবই ভালো ছিল, আলহামদুলিল্লাহ, কেননা কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম আমাদের প্রায় গা ঘেঁষে এক জোড়া ডলফিন লাফ দিয়ে আবার ডুবে গেলো। দর্শকরা সবাই শিশুর মতো আনন্দে চিৎকার করে উঠলো। কী অসম্ভব সুন্দর অভিজ্ঞতা! তারপর চলতেই থাকলো ডলফিনদের ছোটাছুটি। এক জোড়া থেকে দুই জোড়া, তারপর তিন জোড়া, তারপর অনেক অনেক ডলফিন বহুক্ষণ ধরে আমাদের সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে লাগলো। মনে হচ্ছিলো যেন ওরা মহা আনন্দে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোনো অচিন গন্তব্যে ।


একসময় ডলফিনদের ছোটাছুটি শেষ হলো। আমরা আনন্দ ভরা মনে আটলান্টিকের নীল জলের ওপর অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল লাইমস্টোনের হলুদ খাড়া পারের দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম। গাঢ় হলুদ লাইমস্টোন বা চুনাপাথর ২০ মিলিয়ন বছর ধরে বিভিন্ন সময়ের সাগরের নানা পর্যায়ের উচ্চতর ও নিম্নতর লোনাপানির স্তরের সংস্পর্শে এসে ক্ষয় হয়ে হয়ে এই অদ্ভুত সুন্দর বিচিত্র ল্যান্ডস্কেপ, অদ্ভুত আকৃতির প্রাকৃতিক স্তম্ভ ও বিভিন্ন আকারের গুহার জন্ম দিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছিল এ যেনো মহাকাশের অন্য কোনো গ্রহের ভূমিরূপ। সাগর থেকে বিশাল বিশাল প্রশস্ত এসব গুহার মধ্যে প্রবেশ করলে একধরনের গায়ে কাঁটা দেওয়া আদিম অনুভূতি জেগে ওঠে মনের মধ্যে। মনে হচ্ছিল যেন আদিম অসহ্য সুন্দর কোনো অচেনা জগতে আমি ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। কয়েকশ ফুট উঁচু গুহার বিশাল ফুটোর ভেতর দিয়ে সূর্যের তির্যক আলো এসে গুহার ছোট্ট সৈকতে পড়ছে আর সাগরে অন্তহীন ঢেউ এসে সেই সূর্যালোকিত সৈকতের বালুকণাকে ক্রমাগত ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে সাগরের কোলে। সাগরের ঢেউ আর বাতাসের সম্মিলিত মাতাল করা শব্দের সঙ্গে লাইমস্টোনের খাঁজের গর্তে গর্তে বাসা বাঁধা অগণিত সি-গাল এবং অন্যান্য নাম-না-জানা পাখির ডাকাডাকির শব্দ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে এক পরাবাস্তব অভিজ্ঞতার দিকে আমাকে যেন নিমজ্জিত করতে চাচ্ছে আস্তে আস্তে। এর বিপরীতে বেশ কিছু সাহসী তরুণ-তরুণীকে দেখলাম ছোট ছোট প্লাস্টিকের ক্যানোতে (Canoe) করে গুহার অভ্যন্তরের সেই সাগরসৈকতে এসে গুহার আদিমতার সৌন্দর্যকে আরো কাছে থেকে অনুভব করার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ শুয়ে আছে গুহার সৈকতে, কেউ কেউ হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে বালুর ওপর, কেউ কেউ শিশুর মতো সৈকতের ভেজা বালু নিয়ে খেলছে, আবার কেউ কেউ চেষ্টা করেছে গুহার খাজে খাজে পা দিয়ে পর্বতারোহণের মতো ওপরে উঠে যেতে, যা কি না প্রায় অসম্ভব এক চরম বিপজ্জনক কাজ।

আসলেই কী সাহস এদের, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তাল জলরাশিতে ওই হাতে বাওয়া ছোট্ট ক্যানোতে করে তারা এখানে এসেছে। ওদের দিকে তাকিয়ে এই প্রথম আমার নিজেকে অনেক বয়স্ক মনে হলো, মনে হলো যৌবনের অন্য প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে হলেও হেলাল হাফিজ লিখেছিলেন,

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

এখন যাদের যৌবন তাদের উচিত একবারের জন্য হলেও ওই সব আদিম গুহায় ক্যানোতে করে ঢুঁ মারা। এভাবেই কয়েক ঘণ্টা পর আমাদের যাত্রা শেষ হয়। আমাদের ইয়াট আস্তে আস্তে ফিরে আসে তার নির্দিষ্ট পোতাশ্রয়ে। সব নৌযানকেই একদিন তার বন্দরে ফিরে আসতে হয়, আমরাও ফিরে আসি আমাদের বন্দরে। কিন্তু সঙ্গে নিয়ে ফিরি ডলফিনদের ছোটাছুটি আর লাইমস্টোন ল্যান্ডস্কেপের প্রায় অপার্থিব সেই মধুর স্মৃতি। আমি নিশ্চিত আমাদের সবাই সারা জীবন গভীর আবেগে মনে রাখবো এই সুখময় স্মৃতির অভিজ্ঞতা। আলগ্রেভের অভূতপূর্ব ভূমিরূপের অপার সৌন্দর্য আর সুউচ্চ শিলাগাত্রে অদ্ভুত আলো-ছায়া আর নোনা জলের অপূর্ব খেলা একজন মানুষের মনের গভীরে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে যাবে।

আজ আলগ্রেভের লাইমস্টোনের সেই অদ্ভুত প্রাকৃতিক ভাস্কর্যকে মনে পড়ে বারবার । মনে পড়ে সেই গুহার অপার্থিব আলো-আঁধারের কম্পোজিশন। মনে পড়ে আটলান্টিকের সেই অন্তহীন নীল উত্তাল জলরাশি, মনে পড়ে ডলফিনদের সে পাগল করা ছোটাছুটি আর মনে পড়ে শক্তিধরের সেই কথা,

ভাইজান আপনেরা চলি যাবার পরও মনে হয় আপনাদের আমি খুব মিস খরমু।

দেশে আসার পরও শক্তিধর ফোন করেছিল, নানা রকম অপ্রয়োজনীয় কথার পর সে আবার বললো,

ভাইজান, আফনাদের আমি খুব মিস খরি। খেন এতো মিস খরি জানি না, পারলে মাজে মাজে ফুন দিয়েন।

একজন প্রায় অচেনা মানুষ শক্তিধর, যার সঙ্গে মাত্র দুটো দিন আমরা কাটিয়েছি, সে আজও আমাদের মিস করে। একজন মানুষ হিসেবে এটা কী আমার কম পাওয়া? এই অসীম মহাবিশ্ব, এই অনন্ত নক্ষত্রবীথী আর আমাদের এই বিশাল মিল্কিওয়ের মধ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পৃথিবী নামক নীল-সবুজ এই একটি মাত্র গ্রহেই শুধুমাত্র কেউ কাউকে খুব মিস করতে জানে, সঠিক কোন কারণে সে মিস করে তা সে নিজেও জানে না। তবু আমরা সবাই কিছু না কিছু বা কাউকে না কাউকে মিস করি। কী অদ্ভুত সুন্দর আমাদের এ মহাবিশ্ব।

মাহফুজুল হক জগলুল
১৩ জুন, ২০২২

আরও পড়ুন