নামে ‘টোনা গাঙ’, আসলে কিন্তু এটা আমার গ্রামের প্রান্ত সীমানার একটা খাল, গাঙ না।
এখন এই গাঙের ওপর সেতু আছে, গাড়ি চলে। দুই দশক আগেও ছোট খেয়া নৌকাই ছিল পারাপারের একমাত্র ভরসা। রাতে খেয়া বন্ধ হয়ে যেতো।
আমার বাবা গল্প করে একদিন বলছিলেন, যুবক বয়সে পৌষ-মাঘ মাসে রাতের বেলা লুকিয়ে এই গাঙ সাঁতার দিয়ে ওপারে যেতেন যাত্রা দেখতে। আমার বাবা শারীরিকভাবে খুব ছোটখাটো মানুষ ছিলেন। এক রাতে নাকি বাড়ির আরো দুই তাগড়া জ্ঞাতির সঙ্গে যাত্রা দেখার জন্য সাঁতার কেটে যখন খাল পাড়ি দিচ্ছিলেন তখন ওই তাগড়াদের একজন উনাকে মাঝ গাঙে চেপে ধরেছিলেন ডুবিয়ে মারার জন্য… বহু কষ্টে উনি সেদিন অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। সম্পত্তির লোভে মানুষ কতো কুকর্মই না করে। তারপর থেকে বাবা কোনো দিন আর ওভাবে যাত্রা দেখতে যাননি। এটাই প্রথম গল্প নয়, এর আগেও একবার ওই একই লোক আমার বাবাকে উঠোনে উত্তপ্ত ঘন খেজুর রসের বিশাল ড্যাগের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। আমার বাবার শরীরের ডান দিকে কোমর থেকে কাঁধ পর্যন্ত বিশাল পোড়া দাগ ছিল সারা জীবন। সেবারও তিনি কেমন করে যেন বেঁচে যান। তবে বেশ কয়েক মাস মাতৃহীন কিশোর আমার বাবাকে সীমাহীন যন্ত্রণা আর পোড়া চামড়ার বিষাক্ত গন্ধ নিয়ে ভুগতে হয়েছিল।
আমার বাবা আজ বেঁচে নেই। তিনি উনাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। আমাদের বলেছিলেন, এই গল্প উল্লেখ করে আমরা যেন কখনো তাঁকে লজ্জা না দিই। মজার কথা হলো, আমার বাবার চেয়ে বয়সে বড়ো এই মানুষটি আজও বেঁচে আছেন, তাঁর তাগড়া শরীরের সুঠাম গঠন এখনো বোঝা যায়। গ্রামে গেলে প্রায় নিঃসঙ্গ এই মানুষটি আমাকে অনেকক্ষণ বুকে জড়িয়ে ধরে থাকেন আর হু হু করে কাঁদেন, আমার জন্য দুহাত তুলে দোয়া করেন, আমিও তাঁকে জড়িয়ে ধরে থাকি দীর্ঘক্ষণ, কেননা তিনি দেখতে খানিকটা আমার বাবার মতো, আদবের সঙ্গে জিজ্ঞেস করি,
কেমন আছেন চাচা?
দীর্ঘ ঘোরলাগা সেই আলিঙ্গনের মধ্যে আমি আমার বাবার গায়ের গন্ধ পাই, আমার মনে থাকে না এই মানুষটিই পৌষের এক মধ্যরাতে আমার বাবাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন।
জগৎ বড়োই রহস্যময়!
১৭ জুলাই, ২০২০