জ্যোতিষ ভাস্কর নাসির ভাই এবং আমাদের স্থাপত্যে ভর্তির কাহিনি

ভালো নাম স্থপতি কাজি গোলাম নাসির। ‘নাসির ভাই’ নামেই আমরা ডেকে আসছি ৩৮ বছর ধরে। সিনিয়ররা জুনিয়রদের সাধারণত তুমি বলে ডাকে। উনি আমাকে সেই প্রথম থেকেই যেকোনো বিচিত্র কারণেই হোক তুই তুই বলে ডাকেন। আমার যেহেতু কোনো বায়োলজিক্যাল বড়ো ভাই নেই, তাই উনার এই তুই তুই ডাক আমার ভালো লাগে। উনার অনেক পরিচয়বাংলাদেশ সরকারের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান স্থপতি, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন সভাপতি, প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, লেখক, ছড়াকার, আরো অনেক পরিচয় আছে তাঁর। ভবিষ্যতে হয়তো আরো অনেক নতুন নতুন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিচয় অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। কিন্তু উনি যে একজন দুর্দান্ত নির্ভুল ভবিষ্যৎ বক্তা তা কি কেউ জানেন? ১৯৮১ সালে এইচএসসি পাস করে বুয়েটে আর্কিটেকচার আর ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া অন্য কোনো অপশন ওপেন রাখিনি। বাবার ইচ্ছা ছিল ডাক্তার বানাবেন। তাঁকে না জানিয়ে বায়োলজি বাদ দিয়ে মিলিটারি সায়েন্স পড়েছি। মেডিক্যালে পরীক্ষা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, বাবা তা বোধ হয় জানেন না। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য কোনো প্রিপারেশন নিচ্ছি না, তবে বাবাকে দেখানোর জন্য ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পরীক্ষা দেবো, কারণ স্থাপত্য ছাড়া অন্য কোনো বিষয় নিয়ে পড়ার ইচ্ছা আমার নেই। তখন দেশে এতো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, সারা দেশে শুধু সবেধন নীলমণি বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে মাত্র ৪৯টা আসন, বাকি ১টা আসন উপজাতি কোটার জন্য নির্দিষ্ট, ভর্তি পরীক্ষা দেবে হাজার হাজার ছাত্র।

তখন ফোর্থ ইয়ারের ভাইয়েরা আর্কিটেকচারে ভর্তীচ্ছুদের জন্য কোচিংয়ের গাইডবুক বের করেছিলেন আর এই গাইডবুক কিনলে স্থাপত্য বিভাগের ক্লাসরুমে ফ্রি কোচিংয়ের ব্যবস্থা। ১৯৮১ সালের শেষ দিকে আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের চত্বরে ঘোরাঘুরি শুরু করে দিই, যদি কোনো লাইন-টাইন পাওয়া যায়। চারদিকে তাকিয়ে দেখি, চরম স্মার্ট আর জ্ঞানী জ্ঞানী সব ছেলেমেয়ে আমার মতো ঘোরাঘুরি করছে, তবে তারা বেশ সাবলীল, আমার মতো ভীতসন্ত্রস্ত না। আমরা যারা ক্যাডেট কলেজের আবদ্ধ মিলিটারি পরিবেশে কৈশোর আর যৌবনের প্রারম্ভ কাটিয়েছি তাদের অনেকেই ঢাকায় এসে মুক্ত পরিবেশে একাত্ম হতে অনেক সময় নিয়েছি। জড়ো হওয়া অনেকের মধ্যে দেখলাম এখনই অনেকটা আর্কিটেকট আর্কিটেকট ভাব এসে গেছে, নানা রকম আর্কিটেকচারাল টার্ম তাদের কথায় অনায়াসে ফুলঝুরির মতো ঝরছে, তামাম মহাবিশ্বের সব আর্কিটেকটের নাম তাদের মুখস্থ। বব বুই, ভ্রুম্যান, পল রুডল্ফ, মিস ভান্ডার (নামের আগে যেহেতু ‘মিস’ আছে ভাবলাম তরুণী কোনো আর্কিটেক্ট হবে বোধ হয় , Mies-কে Miss ভেবেছিলাম আর কি)। কী সব দাঁতভাঙা কঠিন কঠিন শব্দ শুনছি চারদিকে? নিজেকে খুব ক্ষুদ্র আর অনাহূত মনে হতে লাগলো। আমি তো এক আল্লাহ ছাড়া তখন পর্যন্ত মহাবিশ্বের আর কোনো আর্কিটেকটের নাম জানি না। অন্য এক ভর্তীচ্ছুকে দেখলাম আরো এক কাঠি সরেস। সে নিজে যে শুধু স্থাপত্য বিষয়ে জ্ঞানী তা-ই না, সে প্লিন্থে বসে অন্য ভর্তীচ্ছুদেরও আর্কিটেকচার শেখাচ্ছে। তাকে ঘিরে অনেক ছেলেমেয়ে (মেয়ের সংখ্যাই বেশি), তারা মনোযোগ দিয়ে তার ফ্রি লেকচার শুনছে আর গম্ভীরভাবে মাথা নাড়াচাড়া করছে। অনেকে আবার ছোট নোটবুকে তার মূল্যবান লেকচার দ্রুত নোট করে নিচ্ছে, সে এক মহা হুলস্থুল কাণ্ড।

লেকচার শ্রোতাদের একজনের দেখলাম বেশ চোখ কাড়া আর্টিস্ট আর্টিস্ট নিষ্পাপ চেহারা, লম্বা লম্বা চুল, টকটকে নীল কর্ডের প্যান্ট, কাউবয় বুটের মতো চোখা জুতা আর সুন্দর ছাপা শার্ট পরে লেকচার শুনছে। তবে সে অন্যদের মতো সব কথায় মাথা দোলাচ্ছে না। সে বোধ হয় লেকচারারের সঙ্গে অনেক বিষয়েই একমত না। পরে শুনেছি, ওই মনোযোগী লেকচার শ্রোতার নাম মোহাম্মদ রফিক আজম (পরবর্তী সময়ে বিশাল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি) আর ওই লেকচারদাতার নাম বিকাশ সাউদ আনসারি। বিকাশ সিনিয়রদের সঙ্গে তখনই এমনভাবে কথা বলতো যেন আলরেডি সে অনেক দিনের ছাত্র। ভর্তি পরীক্ষার অনেক আগে থেকেই সে ফ্যাকাল্টিতে সিনিয়রদের কামলা খেটে রাত্রিবাস পর্ব শুরু করে দিয়েছে। আমি মনে মনে বললাম, ‘খাইছে আমারে, এ কোথায় আইলাম!’ পাঞ্জাবি আর জিন্সের ট্রাউজার পরা একজন সুপুরুষ সিনিয়রকে দেখলাম প্লিন্থ এলাকায় ভর্তীচ্ছুদের গ্রাফিকসের জ্ঞানদানে মহাব্যস্ত। উনি দিগ্বিদিক হাত-মুখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে নানা ভঙ্গিমায় উপস্থিত সবাইকে জটিল গ্রাফিকসবিষয়ক জ্ঞান দিচ্ছেন। দেখলাম, উনাকে ঘিরেই জ্ঞানপিপাসুদের সবচেয়ে বড়ো জটলা। এটাও বুঝলাম, উনি বেশ জনপ্রিয়। অনেককে দেখলাম উনাকে মামা মামা বলে ডাকছে। আমি ভাবলাম, প্রতিভাবান সিনিয়রদের বোধ হয় এই ডিপার্টমেন্টে ভাই না বলে মামা ডাকা হয়। কেননা ক্যাডেট কলেজের আবদ্ধ জীবন থেকেই শুনে আসছি আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের সব কিছুই উল্টাপাল্টা। এখানে নাকি স্যাররা সিগারেট খেতে খতে রাত ৩টা-৪টা পর্যন্ত পড়ায় আর ছাত্রছাত্রীরা আধশোয়া হয়ে গিটার বাজাতে বাজাতে ক্লাস করে। তাই ভাবলাম, সিনিয়রদের মামা বলে ডাকাটাই বোধ হয় এখানকার পোস্ট-মডার্ন তরিকা। একজন জ্ঞানপিপাসুর কাছে জিজ্ঞেস করে জানলাম, এই মামার নাম মঞ্জুর কাদের হেমায়েতউদ্দীন।

উনার সঙ্গে আরো দুজনকে দেখলাম, ভারী সুন্দর নয়া জামাইয়ের মতো পাঞ্জাবি পরা মুখে মিটিমিটি হাসিভরা এক ভাই (নাম বলতে চাচ্ছি না) আর অন্যজনের নাম মিজান ভাই (বা মিজান মামা)। এই তিনজন মামাই একই ক্লাসের এবং নিয়মিত প্রতিদিনই নাকি উনারা প্লিন্থে ফ্রি লেকচার দেন। আমি যতোই দেখছি ততোই বিভ্রান্ত আর বিপর্যস্ত হচ্ছি। আমার এ রকম বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখলাম চোখ পিট পিট করে এদিক-ওদিক সতর্ক পর্যবেক্ষণ করতে করতে মাসুদ খান আসছে, ওকে দেখে কলিজায় কিছু পানি এলো। আজও বিপদে-আপদে মাসুদকে দেখলেই শুকনা কলিজায় আমার পানি আসে, সেদিন থেকেই বোধ হয় আমার DNA নির্ভরতার এই ইনফরমেশন সেইভ করে আমার সাব-কনশাস মাইন্ডে রেখে দিয়েছে।

আমাদের দুজনার ‘মাইমেনশিং’য়ের অনেক কমন বন্ধুর সূত্রে মাসুদকে মোটামুটি আগে থেকে চিনতাম। মাসুদ একটা মোটা উলেন কোট পরা ছিল, আমরা তখনো নিজেদের আপনি আপনি বলে ডাকি। মাসুদ বললো,

আরে ভয়ের কী আছে? আমরা কি ফেলনা নাকি? চলেন তো ক্লাসে যাই। কাইট্টাম্বাম।

মাসুদের সঙ্গে আরো অনেক ‘পোলাপান ’। আমি কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে কাগজ, পেন্সিল আর কোচিং গাইডবুক নিয়ে হই হই করতে করতে ক্লাসে ঢুকলাম। ফোর্থ ইয়ারের ভাইদের অনেকেই শিক্ষক হিসেবে উপস্থিত। আর্কিটেকচার নিয়ে তাঁরা অনেক বক্তৃতা দিলেন। কী কী বলেছিলেন আমার মনে নেই, শিক্ষকদের ক্লাসের বক্তৃতা কেন জানি আমার কোনোকালেই মনে থাকে না। যেকোনো কারণেই হোক গোঁফওয়ালা একজন সুদর্শন শিক্ষকের বক্তৃতার সামান্য অংশ মনে আছে। তিনি সবাইকে জিজ্ঞেস করছিলেন, একজন ব্রিটিশ আর একজন বাঙালি যখন চায়ের কাপে এক চামচ চিনি মেশাবেন, তখন তাদের চিনি মেশানোর ভঙ্গিতে কী কী পার্থক্য থাকবে? আমার সাব-কনশাস মাইন্ড আবার বলে উঠলো,

খাইছে, এ কই আইলাম? এগুলা কী কয়?

আর্কিটেকচারের সঙ্গে গরম চা আর চিনির কী সম্পর্ক?

বক্তৃতার পর আঁকার পালা শুরু হলো । আমার আর মাসুদের ভাগে পড়লেন সেই লম্বা গোঁফওয়ালা সুদর্শন শিক্ষক, নাম, নাসির ভাই । সেই দিনই নাসির ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। উনি আমার আর মাসুদের নাম জিজ্ঞাসা করলেন, উনার এক্সেন্টেই বুঝতে পারলাম উনি আমার ‘দেশি’… অর্থাৎ ‘বরিশালের মানু’। এ ছাড়া আরো দুজন খুব নেতাগোছের ব্যস্ত শিক্ষক দেখলাম, মুস্তাক ভাই আর চেঙ্গিস ভাই, উনারাও ‘বরিশালের মানু’। তিন তিনজন ‘দেশি মানু’ পেয়ে আমার শুকনা কলিজা তখন কীর্তনখোলার জোয়ারের পানিতে টইটম্বুর। এতোটুকু অন্তত নিশ্চিত হলাম যে এতো এতো স্মার্ট স্মার্ট পোলাপানের মধ্যে ‘বরিশাইল্লা মানুরাও’ এই সফিস্টিকেটেড বিভাগে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। এরপর থেকে বেশ কনফিডেন্স ফিল করতে শুরু করলাম। নাসির ভাই আমাকে খুব সুন্দরভাবে নরম গলায় বললেন একটা মিউনিসিপ্যালিটির পাবলিক ডাস্টবিন আঁকতে। উনার সুন্দর ব্যবহার আমার জড়তা সম্পূর্ণ দূর করে দিলো। মাসুদকেও উনি কী জানি আঁকতে বললেন। যথাসময়ে আমরা সবাই নাম লিখে আঁকা বস্তু জমা দিলাম। কিছুক্ষণ পর ‘নাসির ভাই’ নামের সেই সুদর্শন শিক্ষক এতো শত শত ছাত্রের মধ্যে শুধু আমার নাম ধরে ডাকলেন, আমার কলিজার পানি আবার শুকিয়ে গেল, ‘কাম সারছে’।

নিশ্চয়ই আমার আঁকায় বড়ো ধরনের কোনো ঝামেলা আছে। উনি আমাকে ডেকে একটা আলাদা জায়গায় নিয়ে গিয়ে বললেন,

এইটা তোমার আঁকা?

স্বীকার করবো, নাকি অস্বীকার করবো, নাকি জোরে দৌড় দেবো, ঠিক করতে পারছি না, কী করি! শেষমেশ বিচারকের সামনে অনেকটা অপরাধ স্বীকার করা পর্যুদস্ত আসামির ভঙ্গিমায় মাথা হেলালাম। উনি খুব দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘তোমার আর কোচিংয়ে আসার দরকার নেই।’ আমি আঁতকে উঠে বললাম,

কেন ভাই, আমার কী দোষ?

উনি খুব কনফিডেন্টলি বললেন,

তুমি এমনিতেই চান্স পেয়ে যাবা, কোচিং লাগবে না, অঙ্কে কেমন?

আমি বললাম,

খারাপ না, মোটামুটি চলে ।

উনি বললেন,

বাসায় যাও, গিয়া মনোযোগ দিয়া অঙ্ক করো। তুমি চান্স পাবা।

এই লোক কয় কী! আমি ক্লাসের বাইরে চলে এলাম, জীবনে ওই এক দিনই কোচিং ক্লাসে গেছি। বাইরে এসে শুনলাম, মাসুদকেও তিনি একই কথা বলে ক্লাসে আর না আসতে বলেছেন। পরে শুনলাম, উনি তৃতীয় আরো একজনকে হুবহু একই কথা বলে কোচিংয়ে আসতে বারণ করেছেন, তার নাম মুস্তফা খালিদ পলাশ। এ দেশের স্থাপত্য সম্বন্ধে যারা সামান্যতম খোঁজ-খবর রাখে কিন্তু এই নাম শোনেনি, এমন লোকের সংখ্যা বর্তমানে এ দেশে বোধ হয় বিরল। জিনিসটাকে আমাদের একটা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে মনে হলো। আমরা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে এই সুদর্শন লোকটি যেকোনো কারণেই হোক আমাদের দুজনকে পছন্দ করছেন না, তাই আমাদের ভুজুংভাজুং দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইছেন। মাসুদ আর আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমি তখন অন্য গাইড খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠলাম। প্রথমে গেলাম আমার ক্যাডেট কলেজে সিনিয়র মাহফুজ ভাইয়ের কাছে। উনি থাকতেন শেরেবাংলা হলে, খুব খেয়ালি মানুষ, উনাকে কখনোই রুমে পেতাম না। অগত্যা অন্য গাইড খুঁজতে লাগলাম। শেষমেশ

আমার বাল্যবন্ধু সেলিম আবেদের মাধ্যমে পেলাম বহু বহু সিনিয়র সাকা ভাইকে। উনি সাক্ষাৎ জাসদ গণবাহিনীর সিরিয়াস ক্যাডার, রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে টক্কর দেওয়া ফাইটার, একেবারে ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ টাইপ ১০০% স্বদেশি প্রাণখোলা মানুষ। রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক টর্চার সহ্য করেছেন, অনেক বছর ড্রপ দিয়েছেন। হলে উনার রুমে মোট ৪/৫ দিন গিয়েছিলাম। উনার সঙ্গে যতোক্ষণ থাকতাম, আর্কিটেকচার নিয়ে উনি খুব সামান্যই আলাপ করতেন, বেশির ভাগ সময়ই আলোচনা করতেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা, গণবাহিনীর প্রাসঙ্গিকতা, চারু মজুমদারের রাজনৈতিক লাইনের সঠিকতা, শ্রেণিশত্রু খতমের লাগসই পদ্ধতি ইত্যাদি নানা আল্ট্রা বাম রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে। আমি মনে মনে ভাবতাম, শালার ফ্যাকাল্টির প্লিন্থের রেডিক্যাল ডানের হাত থেইকা আইসা পড়লাম রেডিক্যাল বামের হাতে ( Fry pan to oven), আমার কপালে দুর্গতি আছে। তবে উনার অকৃত্রিম, আন্তরিক ও মধুর ব্যবহারে আমি মুগ্ধ ছিলাম। পরীক্ষার ২/১ দিন আগে আমার যখন দিশাহারা অবস্থা তখন বোধ হয় উনার কিঞ্চিৎ দয়া হলো, তখন আঁকাআঁকির কিছু টোটকা গ্রামার তিনি আমাকে শিখিয়ে দিলেন আর আমাকে বুঝিয়ে দিলেন যদি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ আর্কিটেকচার সম্বন্ধে প্রশ্ন আসে তবে আমি যেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পুরনো বিল্ডিংটা নিয়ে লিখি।

গ্রুপ ফটো, আমাদের জিরো ব্যাচ , ফটো, শাকুর মজিদ

অন্যদিকে মাসুদ বরাবরের মতো সাহসী মানুষ। ও গেলো ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’-এর লাইনে। ও থাকতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের কোনো রুমে। সে গোপনে নাসির ভাইয়ের শেরেবাংলা হলের রুম নম্বর জোগাড় করে প্রতি রাত ১২টার পর তাঁর রুমে হাজির হয়ে নাসির ভাইয়ের সঙ্গে তুমুল খাতির জমিয়ে ফেললো। তাদের সে খাতির আজও বলবৎ আছে। যা হোক, নির্দিষ্ট দিনে ওল্ড একাডেমি বিল্ডিংয়ে বহু কাঙ্ক্ষিত ভর্তি পরীক্ষা শুরু হলো। প্রায় অন্ধকার এক বেশ উঁচু ছাদওয়ালা রুমে আমার সিট পড়েছিল। আমার কাছেই সিট পড়েছিল আমার ক্যাডেট কলেজের বাল্যবন্ধু হাসান ফেরদৌস কোকোর। পরীক্ষা শুরুর আধাঘণ্টার মধ্যেই ও বেশ শব্দ করেই বলে উঠলো, এই সব ফালতু সাবজেক্ট পড়ার আমার দরকার নেই, বুয়েটে পড়ারও দরকার নেই। এ কথা বলেই ও খাতা জমা দিয়ে চলে গেলো। পরবর্তী সময়ে ও জিওলজি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব ভালো রেজাল্ট করে এবং সেই বুয়েটেই পেট্রোলিয়াম জিওলজি ডিপার্টমেন্টে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়। আমার পরীক্ষা আল্লাহর রহমতে মোটামুটি ভালোই হয়েছিল। পরীক্ষা শেষ করে বের হয়ে দেখি আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের রাস্তার সামনে প্রচণ্ড রোদের মধ্যে দুই হাতে দুটি বিরাট সাইজের ডাব নিয়ে আমার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। পরীক্ষা কেমন হয়েছে সে ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন না করে আমার হাতে দ্রুত একটা ডাব দিয়ে পরম মমতায় আমাকে বললেন, চল, আমরা দুজনে মিলে ডাব খাই। যদিও নাসির ভাইকে তখন বিশ্বাস করিনি, কিন্তু বাস্তবে উনার এই তিন তিনটি ভবিষ্যদ্বাণীই পুরো ১০০% ফলে গিয়েছিল। এ জন্যই উনার নাম দিয়েছি ‘জ্যোতিষ ভাস্কর’। পলাশ, মাসুদ আর আমি, আমরা ৩ জনই আর্কিটেকচারে খুব ভালোভাবে চান্স পেয়েছিলাম। ভবিষ্যদ্বাণী শুধু যে ফলেছে তাই-ই না, কেমন কেমন করে যেন আমি ভর্তি পরীক্ষার মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান পেয়ে গিয়েছিলাম, পলাশ খুব সম্ভবত চতুর্থ হয়েছিল, রফিক আজম তৃতীয় হয়েছিল। প্রথম হয়েছিল ঢাকা বোর্ডের ফার্স্ট স্ট্যান্ড করা ছেলেটি। সে আর্কিটেকচারে ভর্তি হয়নি, তাই প্রথম প্রায় দুই সপ্তাহ আমিই ছিলাম ক্লাসের আনঅফিশিয়াল ফার্স্ট বয় (হা হা হা)। দুই সপ্তাহ পর পলাশ সেই স্থানটা চিরদিনের জন্য নিয়ে নেয়। এখন পর্যন্ত সে সেখানে বসে আছে। আমরা কজন ছাত্ররাজনীতির মধ্যে ডুবে গিয়ে কোথায় ছিটকে পড়ি তার কোনো কূলকিনারা ছিল না। এদিকে ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্টের পরপরই ফ্যাকাল্টি চত্বরে শুরু হলো ভিন্ন মাত্রিক নাটক। কিছু কিছু সিরিয়াস ভর্তীচ্ছুর মধ্যে কোচিং করতে করতে এরই মধ্যে প্রেমপর্ব সারা হয়ে গেছে। রেজাল্টের পর দেখা গেল প্রেমিক চান্স পেয়েছে, প্রেমিকা পায়নি। প্রেমিক অপরাধীর মতো প্রেমিকাকে এটাসেটা বলে ঠাণ্ডা করতে চাচ্ছে; কিন্তু প্রেমিকা প্রেমিকের এই নিষ্ঠুর বিশ্বাসঘাতকতা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। সে এক ভয়াবহ সিরিয়াস ইন্টেলেকচুয়াল মেলোড্রামা। যাই হোক, লেখা বড়ো হয়ে যাচ্ছে, এখানেই থামাই। এ লেখার মাধ্যমে সবাইকে সাবধান করে দিচ্ছি, নাসির ভাই যদি কোনো ভবিষ্যদ্বাণী দেন, তা যেন খুব সিরিয়াসলি নেওয়া হয়। আর এই করোনাকালে তাঁর কাছে ভবিষ্যদ্বাণীর জন্য না যাওয়াই নিরাপদ। কেননা এখন সব মন খারাপ করা ভবিষ্যদ্বাণী আসতে পারে। জগৎ বড়োই রহস্যময়।

১৮ আগস্ট, ২০২০

 

আরও পড়ুন