সারী নদী
সারী নদীকে নাকি বলা হয় সিলেটের ‘নীলনদ’। কেন নীলনদ বলা হয় আমি তা বুঝিনি কেননা গতকাল এ নদীতে নৌকা করে সপরিবারে দলবেধে ঘুরেছি অনেকক্ষণ কিন্তু নীল বা সবুজ পানি আমি দেখিনি।আমি দেখেছি অত্যন্ত স্বচ্ছ পানি, এতো স্বচ্ছ যে পানির নিচে বালি ও পাথর পর্যন্ত দেখা যায়। হয়তো বছরের অন্য সময় এর রঙ পরিবর্তিত হয়। যা ই হোক বন্ধু পরিবার সহ আমার সপরিবারের সারী নদীতে গতকালের নৌভ্রমণটি ছিলো মনে রাখার মতো। চিরচেনা বাংলাদেশের ফ্ল্যাট ল্যান্ডস্কেপের বিপরীতে এখানকার নদী ও এর খাড়া পাহাড়ি পাড় নিয়ে যে ল্যান্ডস্কেপ সেটা একদম ভিন্ন, ঠিক বাংলাদেশ বলে মনে হয় না। নদীর একপাশে অপরূপ লালাখান চা বাগান, অন্য পাড়ে বিশাল সুপারি বন, ছোট্ট একটা দ্বীপ যেটা পুরোটাই এক খন্ড বিশাল পাথর।সব মিলিয়ে মনে হয় যেনো একটা পরাবাস্তব নদীতে ঘুরে বেড়াচ্ছি, আমি ছাড়া আর সবকিছুই যেনো পরাবাস্তবতার অংশ।
এটি একটি ভারত-বাংলাদেশ আন্তসীমান্ত নদী, এর অফিসিয়াল নাম সারী গোয়াইন নদী, মেঘালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে জন্ম নিয়ে এ পাহাড়ি নদীটি এঁকেবেঁকে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশের জৈন্তাপুরে, তারপর অনেক পথ পাড়ি দিয়ে সিংগার খাল নাম নিয়ে মিলেছে গিয়ে কুশিয়ারার সাথে। সুরমা আর কুশিয়ারা মিলিত হয়েই তৈরি হয়েছে আমাদের মেঘনা নদী যা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রাণ। বাংলাদেশের আর এক প্রাণ পদ্মা চাঁদপুরের কাছে মেঘনার সাথে মিলে মেঘনা নামেই বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে।কোথাকার হাজার মাইল দূরের ভারতীয় উপমহাদেশের একদম উত্তরে হিমালয়ের সেই উঁচুতে গঙ্গোত্রী হিমবাহের পানি গঙ্গা-পদ্মা হয়ে আর মেঘালয়ের জৈন্তিয়া পাহাড়ের পানি সুরমা-কুশিয়ারা হয়ে হাজার হাজার জনপদ পাড়ি দিয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে মিশে গেছে আমাদের বঙ্গোপসাগরে।
ভারতীয় শাসন যন্ত্রের একদম ঘোর কেন্দ্রে যারা থাকেন সবসময় কারনে অকারনে তারা যা করেন এ নদীতেও তারা তা করেছেন, অর্থাৎ এ নদীরও উজানে বানিয়েছে বাঁধ যা আমাদের জন্য খুবই আশংকার বিষয়। আমার অনেক ভারতীয় বন্ধু আছে, বাংলাদেশের জন্য তাদের ভালবাসার কোন কমতি নেই, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের এই গভীর ভালবাসা আমাকে প্রচন্ড ভাবে আবেগ তাড়িত করে কিন্ত যখন দেখা যায় তাদের রাষ্ট্রযন্ত্র আমাদের নদীগুলোকে শেষ করে দিয়ে প্রকারান্তরে আমাদেরই শেষ করে দিচ্ছে বা সীমান্তে আমাদের মানুষদের গুলি করে মারছে তখন আমি আমার সেই বন্ধুদের মধ্যে সেই একই প্রেম আর একই ভালবাসার উদ্বেগ দেখিনা যা আমরা দেখেছি ঋত্বিক ঘটক বা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে যারা ১৯৭১ সালে পার্ক স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের শরনার্থীদের জন্য সরাসরি ভিক্ষা করতেন। ঋত্বিক ঘটক বা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উত্তর প্রজন্মের মানুষেরা আজ কোথায় যাদের কাছে ক্ষুদ্র জাতীয়তাবাদ নয় বরং সার্বজনীন মানবতাই প্রধান হয়ে উঠবে।যারা দেশ,কাল ও তথাকথিত রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভোগলাবাজির উর্ধ্বে উঠে এ গ্রহের স্বাস্থ্য নিয়ে বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে ভাবতে ও এক্ট করতে শিখবে।মনে রাখতে হবে নির্বিচারে বাঁধ দিয়ে যতোই নদীর পানি নিজের কোলে টেনে নিয়ে সাময়িক ভাবে বোকার মতো জিততে চাই না কেন আখেরে নদী মরে গেলে আমরা সবাই ই শেষ হয়ে যাবো কেননা আমাদের প্রকৃতি এক ও অভিন্ন আর আমাদের এই অভিন্ন প্রকৃতি ইংরেজ বাবু সিরিল জন রেডক্লিফের কাঁটাতারের কৃত্রিম সীমান্ত বোঝে না। গোখলে বলেছিলেন What Bengal thinks today India thinks tomorrow, দু’পাড়ের অবুঝ বাঙালি কবে এসব আত্মবিধ্বংসী খেলা বুঝবে কে জানে। যা হোক নদীর রচনা লিখতে গিয়ে গরুর রচনা শুরু করেছি। খাইসলত খারাপ হয়ে গেছে, ছাত্র বয়সে বামপন্থী রাজনীতি করার কুফল।
আমাদের নৌকা আস্তে আস্তে জিরো পয়েন্টে আসলো, অর্থাৎ মানচিত্রের বাংলাদেশ এখানে শেষ আর মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি এখানে শুরু। এ গ্রহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় এই চেরাপুঞ্জিতে, চেরাপুঞ্জির সেই বিশাল পরিমাণ জলরাশি পাহাড়ি ঢল হয়ে হুড় হুড় করে নেমে আসে এই সারী নদীর গিরিখাত দিয়ে। এ অংশে পানি যতোই বেশি পরিমাণ হোক না কেন অন্যসব নদীর মতো দু’কুল প্লাবিত করতে পারে না এ নদী কেননা এখানে নদীর পাড় একদম খাড়া আর কোন কোন জায়গায় তিন-চারশ ফুটেরও বেশি উঁচু। আশ্চর্য হলেও জিরো পয়েন্টে পানি খুবই কম তবে বেশ ঠান্ডা, হাটু পর্যন্তও ভেজে না। স্বাভাবিক ভাবে দলের সবাই নদীর পানিতে নেমে গেলাম। পায়ে পানির স্রোত টের পাচ্ছি। যেখানে দাড়াচ্ছি পায়ের নিচ থেকে বালি সরে যাচ্ছে।বালিগুলো খুব মোটা, কন্সট্রাকশনের ভাষায় একে বলে ”Sylhet Sand’, কনক্রিট ঢালাইয়ের জন্য এ বালি খুবই উপযোগী। স্থানীয় কিছু মানুষকে দেখলাম বিশাল তিনকোনা খোচইন জাল দিয়ে মাছ ধরছে, তবে মাছ ধরার সময় মানুষের চোখেমুখে যে স্বাভাবিক উত্তেজনা থাকে সেটা তাদের মধ্যে দেখছিলাম না। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম যে তারা আসলে মাছ ধরছেনা, তারা নদীর পানির সাথে মেঘালয়েরর কয়লা খনি সম্বৃদ্ধ অঞ্চল থেকে ভেসে আসা কয়লা সংগ্রহ করছে। সারাদিন ২/৩ জনের এক একটি দল ২/৩ বস্তা কয়লা সংগ্রহ করতে পারে। প্রতি বস্তা কয়লা তারা বিক্রি করে ৭০০ টাকায়।
দু’পাড় খাড়া উঁচু পাহাড় অনেকটা দুর্গম ভূমিরূপ নিয়ে নদীটির সবচেয়ে সুন্দর অংশের নামটা কিন্তু তেমন সুন্দর না, এ এলাকার মানুষ এর নাম দিয়েছে লালাখাল। প্রখ্যাত কবি ও লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ফরিদপুরের মানুষ ছিলেন, বৃহত্তর ফরিদপুরের আড়িয়াল খাঁর মতো সুন্দর নদীটির নাম শুনলেই তার নাকি একজন রাগী ডাকাত সর্দারের কথা মনে আসতো। লালাখাল নাম শুনেও তেমনিভাবে কেন যেনো আমার মানসচক্ষে একজন ক্ষমতাবান গ্রাম্য মাতব্বরের চেহারা ভেসে আসলো। আসলে হয়তো তেমন কিছুই না,পুরোটাই আমার ভুল ভাবনা , লালা হয়তো অত্যাচারী ভূস্বামীর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা কোন বিদ্রোহী ভূমিপুত্রের নাম ছিলো, অথবা এমনও হতে পারে সে হয়তো ছিলো এক উদাস প্রেমিক, আলস প্রহরে যে এই নদীর পাড়ে বসে বসে বাঁশী বাজিয়ে সে মাতিয়ে রাখতো সমগ্র চরাচর। জগতের কতটুকুই বা আমরা জানি, তারপরও জগতের স্বপ্নের সাথে নিজের স্বপ্ন মিলিয়ে কল্পনা করতে দোষ কী।
মাহফুজুল হক জগলুল
৭ মে,২০২২
