রুমানি: এক স্বর্ণ দন্ত আরব কোচওয়ানের গল্প

রুমানি: এক স্বর্ণ দন্ত আরব কোচওয়ানের গল্প

ঈদের পর মিশর ভ্রমণে এসে ঐতিহাসিক বিখ্যাত সব মৃত মানুষের গল্প কয়েক দিন ধরে লিখেই যাচ্ছি, এবার একজন জীবন্ত মানুষের গল্প বলি। গাঢ় রঙের ময়লা উত্তর আফ্রিকান গালাবিয়া পরিধান করা এক বৃদ্ধের নাম রুমানি। মুখ না খুললেও তার একটি দাঁতের অর্ধাংশ বেরিয়ে থাকে। সে দাঁতটি আবার সোনার তৈরি। প্রথম দর্শনেই মনে হবে যেন আরব্য রজনী থেকে কোনো এক ক্ল্যাসিকাল চরিত্র কীভাবে যেন উঠে এসে হাজির হয়েছে আপনার চোখের সামনে।

নীল নদের পাড় ঘেঁষে মিশরের ঐতিহাসিক লাক্সর শহরের রাস্তায় স্বাস্থ্যবান একটি সাদা আরবি ঘোড়া টানা গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন এ বৃদ্ধ চরিত্রটি। আমি যখন তার গাড়িতে চলে লাক্সর শহর ঘুরছিলাম, ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে এটা-সেটা অনেক কথা বলার মাঝেই গাড়ির সামনে রাখা তাজা ঘাস দেখিয়ে বৃদ্ধ খুব মজা করে বললেন—মোটরগাড়ির জ্বালানি যেমন পেট্রোল, আমার এ ঘোড়াগাড়ির জ্বালানি হচ্ছে তাজা সবুজ আলফা ঘাস।

লাক্সর শহরে দু-তিন মাইল রাস্তা অনায়াসে ঘোড়ার গাড়িতে ৫০ ইজিপশিয়ান পাউন্ড, অর্থাৎ ১২৫ টাকায় চলে যাওয়া যায়। তবে প্রথমে এরা চাইবে, ৫০০ পাউন্ড। সঠিক দামে যেতে চাইলে তারপর আপনাকে কোনো দরাদরি করতে হবে না। আপনার কাজ হলো শুধু নিরবচ্ছিন্ন ধ্যানমগ্ন দার্শনিকের মতো চুপ থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা। এমন একটা ভাব করবেন যেন ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার মতো তুচ্ছ জাগতিক বিষয় নিয়ে চিন্তা করার মতো সময় আপনার হাতে নেই, আপনি মহাজাগতিক নানান জটিল সব সমীকরণের সূত্র আবিষ্কারে নিমগ্ন। আপনার এ ওষুধে নিমেষে কাজ হবে, দেখতে না দেখতে, দেখবেন স্বয়ংক্রিয় ভাবে ৪০০, ৩৫০, ৩০০, ২৫০, ২০০ করে করে এভাবে ভাড়া ১৫০-এ নেমে আসতে এরা সময় নেবে বড়জোর ৪৫ সেকেন্ড। এখনই হলো মাহেন্দ্রক্ষণ—১৫০-এ নামার পর এবার আপনি জগতের এসব বৈষয়িক ব্যাপার-স্যাপার উপেক্ষাকারী একটা চরম বৈরাগ্যের ভাব নিয়ে যখন আস্তে হাঁটা শুরু করবেন—এক সেকেন্ডের মধ্যে দেখবেন ভাড়া ১৫০ থেকে একলাফে ৫০-এ নেবে আসবে এবং ধরা খাওয়া পরাজিত সেনাপতির মতো ও বলবে—ইয়াআল্লাহ, খালাস। অর্থাৎ, আর নামতে পারব না ভাই, মাফ চাই, এবার চলো।

এর অর্থ হচ্ছে, উভয়পক্ষকেই নাটক বন্ধ করে সন্ধিতে আসতে হবে। অর্থাৎ, মুলামুলি বা দামাদামির নাটক খালাস।

এভাবেই ৫০ পাউন্ডে দফারফা করে রাত সাড়ে ১২টায় নীল নদের পাশের এক কফিশপ থেকে যখন হোটেলে এসে পৌঁছলাম, তখন আশ্চর্য হয়ে দেখলাম তার চোখেমুখে কিছুক্ষণ আগে চলা আমাদের দরদামের যুদ্ধের কোনো ছায়া বা ছাপই নেই। বরং আমার হাত ধরে পরম মমতায় তিনি আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিলেন। মুখে তার তখনো সৌম্য-শান্ত এক ধরনের স্মিত বিরল হাসি। সে হাসি আমাদের মতো মধ্যবিত্ত তথাকথিত শিক্ষিতদের মুখে সাধারণত দেখা যায় না।

এতক্ষণ আমি ভাবছিলাম, আমি মহা জিতা জিতেছি, কিন্তু অন্যপক্ষ যাকে এত কীর্তিকলাপ করে ৫০০ থেকে ৫০-এ নামিয়ে এনে নিজেকে খুব তালেবর মনে করছি; তার মুখে এমন তৃপ্তির হাসি কেন? তার মধ্যে এত নির্ভেজাল অভিযোগ হীন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ ও এত সুখী ভাব আসে কোথা থেকে?

শুনেছি কোকা-কোলার একটি বোতলে যে মালমশলা থাকে তার বাজারমূল্য ১২ পয়সা কিন্তু আমরা বিনা দামাদামিতে তা ২০ টাকা দিয়ে কিনি। ৬ টাকার ম্যাটেরিয়ালের প্রসেসড প্যাকেট নুডলস ৮০ টাকায় কিনি। আমার এক চীনা বন্ধুর কাছে শুনেছি, চীনের বিখ্যাত আইফোন সিটি নামে খ্যাত হেনান প্রদেশের ঝেংঝোতে অ্যাপেল কোম্পানি একটি আইফোন বানাতে মাত্র ১০ ডলার খরচ করে, যা আমরা দেড় লাখ টাকায় কিনে একে ওকে দেখাই। কিন্তু গরিব রিকশাওয়ালা বা সবজিওয়ালা এদের শ্রমের মূল্য দেওয়ার সময় আমাদের শৌর্যবীর্য জেগে ওঠে। যেভাবেই হোক দাম কম না দিতে পারলে আমাদের মনে বিজয়ী বীরের স্বাচ্ছন্দ্যবোধ আসে না।

এসব ভাবতে ভাবতে পকেট থেকে ঘোড়াগাড়ির নির্ধারিত ভাড়া, ৫০ পাউন্ডের নোট বের করতে গিয়ে দেখি আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে। ৭৫ বছরের বৃদ্ধ রুমানির তৃপ্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় স্মিত হাসি আমার কলিজা কাঁপিয়ে দিয়েছে। এলিট কফি শপে ৬০০ টাকায় সামান্য এক কাপ কফি খেয়ে ওয়েটারকে আমরা অনায়াসে ১৫০-২০০ টাকা টিপস দিই, তখন আমাদের গায়ে লাগে না কিন্তু সারা দিন উত্তর আফ্রিকার তীব্র রোদের মধ্যে সারা দিন ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে কতইবা আয় করেন এ বৃদ্ধ, কিন্তু তাকে সামান্য কিছু বেশি পারিশ্রমিক দিতে আমার এতরকম নাটক-তামাশা করতে হলো।

পরিশেষে তাকে কত দিয়েছিলাম তা বলতে চাচ্ছি না, কিন্তু বৃদ্ধ রুমানি চলে যাওয়ার আগে ভালোবেসে সামান্য সময়ের জন্য আমাকে বড় ভাইয়ের মতো জড়িয়ে ধরেছিলেন। তারপর যথারীতি আমরা দুজন দুদিকে চলে গেলাম, আমরা হয়তো একে অন্যকে আর মনে রাখব না। রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টার গল্পের ভাষায়—পৃথিবীতে কে কাহার, কিন্তু তখনো পিচঢালা পথের ওপর অচেনা এক আরবদেশি বৃদ্ধ রুমানির সাদা ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যাচ্ছে, অথবা শব্দ হয়তো শোনা যাচ্ছে না, শব্দটা আমার বুকের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে।

মাহফুজুল হক জগলুল

লুক্সর, মিশর

০৩.০৪.২০২৫

 

পূর্বে প্রকাশিত লিঙ্ক

আরও পড়ুন