কৃষ্ণ হৃদয়ের নীল হ্রদে একদিন
প্রথম পর্ব
(এর আগে মঙ্গোলিয়া, সাহসী মানুষের দেশে : দ্বাদশ পর্ব পর্যন্ত লিখেছিলাম। তারপর যথারীতি ত্রয়োদশ পর্ব লেখা উচিত ছিল আর সে পর্বগুলো অনেক ইন্টারেস্টিংও; কিন্তু কেন যেন সেগুলো এড়িয়ে আপাতত অষ্টাদশ পর্ব থেকে লেখা শুরু করতে ইচ্ছে করলো। আমি যেহেতু পেশাদার লেখক নই, শুধু মনের আনন্দে লিখি, তাই মন যা চায় তাই করলাম। পরের পর্বগুলো আগে লিখে ফেললাম, আগের পর্বগুলো ভালো লাগলে পরে একসময় হয়তো লিখে ফেলা যাবে )
১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আমাদের দলসহ স্থপতিদের প্রায় সবাই মঙ্গোলিয়া ছেড়ে গেছে, শুধু আমি একা রয়ে গেছি। আমি আগেই বলেছি, মঙ্গোলিয়ার প্রতি আমার অন্য রকম একটা আকর্ষণ সেই বাল্যকাল থেকেই। তাই আমি আরো একটু গভীরভাবে দেশটাকে দেখতে ও বুঝতে চাচ্ছিলাম। আমি আর বাতা পরিকল্পনা করলাম ১২ সেপ্টেম্বর উলানবাটোর থেকে প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার পূর্বে একটা সাদু পানির হ্রদ দেখতে যাবো। এতোদিন পর্যন্ত দেখেছি আদিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমি, নমনীয় ঢালের পাহাড়, বিস্তীর্ণ মরুভূমি আর বিশাল বিশাল শিলাস্তরে বিস্ময়কর ভূমিরূপ; কিন্তু তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য জলাধার দেখিনি। তাই বাতা যখনই বললো এ হ্রদের কথা, তখন সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। বাতা বললো, হ্রদ দেখতে চাইলে খুব ভোরে রওনা দিতে হবে। কিন্তু এই ব্যাপারটায় আমি খুব দুর্বল, আমি কখনোই ‘আর্লি রাইজার টাইপ’ গোছানো চরিত্রের মানুষ নই। স্থপতি কাজি আরিফের মতো রাত ৩টা-৪টা পর্যন্ত বিরতিহীন জম্পেশ আড্ডা এবং তার সঙ্গে আড্ডার জন্য প্রয়োজনীয় সব লজিস্টিক ও সরবরাহের নিশ্চিত ব্যবস্থা করে সবাইকে জাগিয়ে রেখে সকাল ৮টার সময় আবার নির্বিকার ফুলবাবু সেজে গুরুগম্ভীর ফরমাল আলোচনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার মতো জীবনীশক্তি আমার নেই। তবে ভ্রমণে গেলে প্রায়শই এ কাজটি আমাকে করতে হয়, কেননা গভীর রাতে কাজি আরিফের সুপরিকল্পিত পাতানো আড্ডার লোভ শেষমেশ সামলাতে পারি না। আবার রাতভর আড্ডা দিতে গিয়ে পরের দিনের ভ্রমণের অস্বস্তিকর ক্লান্তিকর দুরবস্থাও এড়াতে পারি না, এ দুয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা এই বয়সে আমার জন্য খুব কষ্টকর কাজ। যাই হোক, বাতার সঙ্গে অনেক মুলামুলির পর সকাল ৯টায় আমরা যাত্রা শুরু করতে রাজি হই।
এবার বলে নিই কে এই বাতা। পুরো নাম বাতজোরিগ নেরগুই, যার অর্থ হচ্ছে বলবান ও সাহসী পুরুষ । বাতা হলো খুব উচ্চ শিক্ষিত মঙ্গোলীয় এক ট্যুর গাইড। আমাদের ক্যাডেট কলেজের এক বছরের সিনিয়র চীন ও মঙ্গোলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাহবুবুজ্জামান শাকিল ভাইয়ের মাধ্যমে কাজি আরিফের সঙ্গে তার পরিচয় আর কাজি আরিফের মাধ্যমে আমার সঙ্গে তার যোগাযোগ মঙ্গোলিয়া আসার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই। এমন কমিটেড ট্যুর গাইড আমি আমার জীবনে দেখিনি । এটাকে শুধু সে তার পেশা হিসেবে নেয়নি, ছোটবেলা থেকেই ট্যুর গাইড হওয়ার মাধ্যমে পর্যটকদের সঙ্গে সারা মঙ্গোলিয়া ঘুরে বেড়ানোই ছিল তার জীবনের একমাত্র স্বপ্ন। এ কারণে সে ট্যুরিজমের ওপর গ্র্যাজুয়েশন করেছে , পরে মাস্টার্সও করেছে । ট্যুরিস্টদের সুবিধার জন্য আমেরিকান এক্সেন্টে ইংরেজি ভাষা শিখেছে খুব নিখুঁতভাবে। সে নিজেই গাইড, নিজেই মঙ্গোলিয়ান ইতিহাসবিদ, নিজেই ড্রাইভার, নিজের বাজার করে আনা জিনিসপত্র দিয়ে দারুণ স্বাদের রান্না করতে জানা কুক। আমি যখন তাকে বললাম, আমি হালাল মাংস ছাড়া খাবো না, তখন সে বহু কষ্ট করে আমার জন্য মুসলিম দোকান থেকে ভেড়ার মাংস কিনে এনে উলানবাটোর থেকে কয়েকশ মাইল দূরে জনমানবহীন বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মধ্যে তা মঙ্গোলীয় ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতিতে স্টোন গ্রিল করে খাইয়েছে। বাতা না হলে আমি আসল মঙ্গোলীয় খাবারের স্বাদ কোনো দিনও পেতাম না, কেননা মঙ্গোলীয় খাবার মানেই মাংসের নানা পদ।
আসল কথা হলো, সবজি খাওয়ার সুযোগ এরা পাবে কোথায়? তাজা শাকসবজি এদের অনেকে সারা জীবনে চোখেও দেখেনি, হয়তো শুকনো সবজি বা ক্যান সবজি অনেক খেয়েছে; কিন্তু তাজা শাকসবজি দেখার সুযোগ তাদের অনেকের কখনোই আসেনি। মঙ্গোলিয়ায় বিভিন্ন পথে যেতে যেতে অনেক গ্রামীণ বাজারে গেছি, যেখানে রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা বয়স্কা মহিলাদের বিভিন্ন সবজি বিশাল বিশাল কাচের বৈয়মের সিরকার মধ্যে ডুবানো অবস্থায় বেচতে দেখেছি। এসবের মধ্যে কচি শসা, গাজর, শিম, রসুন- এসবই বেশি। আমরা কয়েক বৈয়ম এমন সিরকায় ভেজানো শসা কিনেছিলাম। আমাদের সফরসঙ্গী এনায়েত কবিরের হাত থেকে পড়ে গিয়ে সবচেয়ে বড় শসার বৈয়মটা ভেঙে যায়, তার পরও অন্য সব বৈয়মের শসা গাড়িতে বসে বসে খেয়ে শেষ করতে আমাদের বেশি সময় লাগেনি।
এসব শীতের দেশে সবজির দুষ্প্রাপ্যতা নিয়ে আমার জীবনের একটা বাস্তব ঘটনা বলি। আমি আমার এক রাশিয়ান বন্ধুর সঙ্গে বহু বছর আগে একবার মস্কো গিয়েছিলাম। আমার বন্ধু খুব আমুদে মানুষ। যাকে কাছে পায় তার সঙ্গেই বিরামহীন গল্প শুরু করে দেয়। মস্কো এয়ারপোর্ট থেকে তার অ্যাপার্টমেন্টে চলে আসা পর্যন্ত ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে শুরু হলো তার বিরামহীন গল্প বলা। যদিও তারা রাশান ভাষায় গল্প করছিল, তবে আমি তাদের দেহভাষা অবলোকন করে বেশ বুঝতে পারছিলাম তাদের বেশির ভাগ গল্পেরই বিষয়বস্তু সুস্পষ্ট আদিরসাত্মক ক্যাটাগরির। বন্ধু একপর্যায়ে যখন বুঝতে পারলো যে আমি তাদের কথাবার্তা কিছুই বুঝছি না এবং কিছুটা বিরক্ত বোধ করছি, তখন সে কিছুটা দয়াপরবশ হয়ে আমাকে বললো যে তাদের আলাপের বিষয় হচ্ছে রাশান মেয়েদের চেয়ে ইউক্রেনের মেয়েরা দেখতে অনেক বেশি সুশ্রী কেন, সেটার তুলনামূলক কার্যকারণ তারা দুজন মিলে গবেষণা করার চেষ্টা করছে এবং এও জানালো যে তাদের উভয়ের স্ত্রীরাও ইউক্রেনীয়। সত্যি কথা বলতে গেলে তখন আমি দেখেছি মস্কোর প্রায় প্রতি পরিবারেই কোনো না কোনো ইউক্রেনীয় সদস্য আছে। তাদের পারস্পরিক আচরণে মনে হতো, এরা যেন একই দেশের নাগরিক; যদিও এখন তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।
গল্পের এক পর্যায়ে তাদের চটুল বন্ধুত্ব এতো গভীরতায় পৌঁছে গেলো যে ড্রাইভার তার গাড়ির গোপন একটা কম্পার্টমেন্ট থেকে কালো কাপড়ে মোড়ানো একটা ভদকার বোতল বের করে এনে তাকে খেতে দিলো। ভদকার বিনিময়ে আমার বন্ধু তাকে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাওয়া এক জোড়া তাজা পটোল দিলো। আমি ভাবলাম দামি এক বোতল ভদকার বিপরীতে সামান্য দুটো পটল- এ কেমন প্রতিদান? শুধু খালি বোতলের দাম দিয়েই তো এক কেজি পটোল কেনা যায়। প্রতিদান না বলে আমার হয়তো প্রতি-উপহার লেখা উচিত ছিলো। আমরা সাধারণত প্রতি-উপহার হিসেবে যা দিই তা সাধারণত সমমানের, সমমূল্যের বা আরো কিছুটা উঁচুমানের জিনিস দিয়ে থাকি। এখানে ভদকার বিপরীতে দুটো পটোল তো কোনো মানদণ্ডেই সমমানের হতে পারে না। আমি আমার বন্ধুর বিবেচনা বোধ দেখে খুব বিরক্ত হলাম। কিন্তু আমার ভুল বুঝতে বেশি দেরি হলো না। হঠাৎ দেখলাম ড্রাইভার হাইওয়ের পাশে গাড়ি থামিয়ে চরম আবেগে আপ্লুত হয়ে পটোল দুটোর ওপর পরম মায়ায় হাত বোলাচ্ছে। মনে হচ্ছিল যেন প্রেমিক তার প্রেমিকার পেলব গালে পরম আদরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তার চোখ দুটো অকৃত্রিম আবেগে ছলছল করছে। যেকোনো মুহূর্তে অশ্রুপাত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। আমার বন্ধুকে দেখলাম মিটিমিটি হাসছে আর রাশান ভাষায় কী যেন বলছে। ট্যাক্সিতে তিনজনের মধ্যে আমিই একমাত্র ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্মিত ও হতভম্ব অথবা বলা বলা যেতে পারে বোকা বনে গেছি, আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছি না।
কিছুক্ষণ পর ড্রাইভার আবেগে গদগদ হয়ে ঝরঝর করে একগাদা কথা বলে ফেললো। আমি এবার আমার বন্ধুর মুখের দিকে তাকালাম, এ নাটকের আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। বন্ধু আমাকে যা বললো তা হচ্ছে, এই ট্যাক্সি ড্রাইভার সাইবেরিয়ার ইয়াকুতস্ক থেকে দুইশ কিলোমিটার দূরের এক গ্রামের মানুষ, মস্কো এসেছে মাত্র কয়েক মাস। সে তার সমগ্র জীবনে এই প্রথম কোনো তাজা সবজি নিজের হাতে ধরে দেখেছে। পটোল তো জীবনে দেখেই নাই। ঘন সবুজের ওপর সাদা ডোরাকাটা এই অদ্ভুত আবেদনময়ী পটোল জাতীয় বস্তু যে এ পৃথিবীতে বিদ্যমান তা সে জানতোই না। অপূর্ব সুন্দর বডি ফর্মধারী এই পটোলকে তার কাছে মনে হয়েছে অন্য গ্রহের কোনো বস্ত। মনে মনে ভাবছিলাম, এ ব্যাটা ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলি যে আমাদের দেশের মেয়েদের সুন্দর চোখের উপমা দেওয়া হয় এই পটোল দিয়েই। তাদের চোখকে বলা হয় পটোল চেরা আঁখি। এ গল্পটা বলার উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর অনেক অঞ্চলের মানুষের কাছে সবজি জিনিসটা খুবই দুষ্প্রাপ্য। আমদের দেশে আমরা যেমন সবজি নিয়ে হেলাফেলা করি, সবার কাছে সবজি তেমন হেলাফেলার জিনিস নয়। মঙ্গোলীয় যাযাবরদের কাছে তাজা সবজি অত্যন্ত সমাদরের বস্তু।
কাটায় কাটায় সকাল ৯টায় আমার ফোন বেজে উঠলো। পরম পাংচুয়াল বাতা তার গাড়ি নিয়ে কথা অনুযায়ী হোটেলের পার্কিংয়ে অপেক্ষা করছে। আমি তখনো খালি গায়ে লুঙ্গি পরে মাত্র গোসলখানা থেকে বেরিয়ে মাথায় তোয়ালে ঘষে ঘষে খুব আয়েশে চুল শুকোনোর কসরত করছি। জামাকাপড় পরবো, নাশতা খাবো, তারপর নিচে নামতে পারবো। আর মঙ্গোলিয়ার শীতে জামাকাপড় মানে তো আর একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার্স না। পরতের পর পরত, তার পরও কয়েক পরত। গেঞ্জি, জামা, জাম্পার, সোয়েটার, থার্মাল জ্যাকেট, মাফলার, নানা কিসিমের জিনিস পরতে হয়। আমি খুব আরামপ্রিয় মানুষ। আরামপ্রিয় না বলে ঝঞ্ঝট এড়িয়ে চলা মানুষ বললে বোধ হয় বেশি উপযুক্ত হয়। পোশাক-আশাকের ঝঞ্ঝট আমার একদম সহ্য হয় না। সে কারণে আমি সাধারণত পায়ে মোজাও পরি না, সারা বুয়েট জীবন একই ডিজাইনের একটা বাটার স্যান্ডেল পরে কাটিয়ে দিয়েছি, সেটা ছিঁড়ে গেলে হুবহু সেই ডিজাইনেরই আরেকখানা কিনে পরেছি। একমাত্র কারণ, ফুটবেড সংবলিত স্যান্ডেলের মডেলটা ছিল পায়ের জন্য খুব আরামদায়ক। এ নিয়ে আমাকে অনেকে ঠাট্টা-তামাশা করতো। খুব সম্ভবত এ কারণেই ছাত্রজীবনে কোনো মেয়ে আমার দিকে কখনো প্রেমময় দৃষ্টিতে ভুলেও তাকায়নি। ভেবেছে, যে বান্দা একই ডিজাইনের স্যান্ডেল পরে বছরের পর বছর পার করে দিতে পারে, এমন বোরিং মানুষের মধ্যে আর যতো কিছুই থাকুক প্রেমরস এক বিন্দুও নেই। তবে এখন আমি আর ফরমাল কাজকর্মে স্যান্ডেল পরি না, পরি মোকাসিন গোত্রের জুতা। তবে জুতা পরেও রক্ষা হয়নি, আমার স্ত্রীও ওই একই কথা বলে, অর্থাৎ আমার মধ্যে যে বিন্দুমাত্র প্রেমরস নেই তা সে বিনা দ্বিধায় প্রতিনিয়ত কারণে-অকারণে উঁচু স্বরে ঘোষণা করে বেড়ায়।
ফিরে আসি মোকাসিন জুতার কথায়। মোকাসিন শব্দটি আসলে উত্তর আমেরিকায় কলম্বাসের শাগরেদদের দ্বারা কচুকাটা হওয়া তথাকথিত রেড ইন্ডিয়ানদের ভাষার শব্দ। তাদের ভাষায় মোকাসিন শব্দের অর্থ জুতা। তার মানে, মোকাসিন জুতা অনুবাদ করলে দাঁড়াবে, জুতা জুতা। যেমন পাউ মানে পর্তুগিজ ভাষায় রুটি। আমরা বলি পাউরুটি, যা অনুবাদ করলে হবে, রুটি রুটি।
মোকাসিন জুতা অনেকটা পাম্প সু টাইপের, তবে এ জুতার ভেতরে কচি ভেড়ার চামড়ার ইনার লাইনিং দেওয়া থাকে, তাই এটা মোজা ছাড়া পরা যায়। এ জুতায় হিল প্রায় নেই বললেই চলে, আর এ জুতায় ফিতাও লাগে না আর ফিতা থাকলেও সেটা খোলা বা বাঁধা লাগে না, ফিতা না খুলেও জুতা পরা বা খোলা যায়। তাই আমার মতো আরামপ্রিয় অলসদের জন্য এটা একদম আদর্শ জুতা। জুতার ফিতা লাগানো আর খোলা আমার কাছে অত্যন্ত জটিল ও বিরক্তিকর একটি অপ্রয়োজনীয় কাজ বলে মনে হয়। তবে মঙ্গোলিয়ার শীতে মোটা মোজা অবশ্যই পরতে হবে। সব মিলিয়ে জামাকাপড় পরে ফুলবাবু সেজে এতো কম সময়ের মধ্যে বের হওয়া এক মহাতেলেসমাতি কারবার। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ভাষায় যাকে বলা যায়, ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস।
আমি বাতাকে যতোদূর পারা যায় খুব মোলায়েম কণ্ঠে ফোনে বিশ মিনিট ভিক্ষা চাইলাম, যদিও জানি ত্রিশ মিনিটের কমে আমি কিছুতেই নাশতা সেরে বের হতে পারবো না। আমি বাঙালি, আমাদের কাছে যাহা বিশ তাহাই ত্রিশ, তাই দশ মিনিট অতিরিক্ত দেরি করলে সেটা বাতার সঙ্গে ম্যানেজ করে নেওয়া যাবে। তবে ফ্রি বুফে ব্রেকফাস্টে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। নামিদামি স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা বলেছেন,
‘Breakfast like a king; lunch like a prince; dinner like a pauper.’
শেষের দুটো না মানলেও প্রথমটা মানার ক্ষেত্রে আমি অত্যন্ত খালিস ঈমানদার এবং পাক্কা আমলদার। তা ছাড়া হোটেলের বুফে ব্রেকফাস্ট মনের মধ্যে (পেটের মধ্যে ততোটা নয়) সবার মতো আমার মধ্যেও কেমন জানি এক ধরনের আগ্রাসী (অথবা গোগ্রাসী) উন্মাদনার জন্ম দেয়। সব আইটেম থেকেই কিছু না কিছু নিতে ইচ্ছে করে। বিশেষ করে ডিম। বাসায় প্রতি সকালে প্রায় স্বাদহীন সিদ্ধ ডিমের সাদা অংশটা কোনো রকমে শুধু গলা দিয়ে ঠেলে দিই। কুসুমটার দিকে করুণ চোখে কয়েকবার তাকাই কিন্তু খাই না। একপর্যায়ে আমার পায়ের কাছে অপেক্ষারত আমার ছেলের দুই বিড়ালের মধ্যে ভাগ করে সেটা দিয়ে দিই। দিয়ে দিই না বলে বিসর্জন দিই বলাটা বোধ হয় বেশি উপযুক্ত । কিন্তু অন্য সবার দেখাদেখি হোটেলের ফ্রি বুফে ব্রেকফাস্টে আমি সব সময় ডাবল ডিমের পোচ অর্ডার করি। আমি বাঙালি, ডাবল ডিম অর্ডার তো করবোই। আমার সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের এক বন্ধু বলতো,
বাঙালি ফ্রি পাইলে নতুন দামি রুহিতপুরী লুঙ্গি পাইতা আলকাতরা নেয়।
ফ্রি পাইলে যদি নতুন লুঙ্গি পেতে আলকাতরা নেওয়া জায়েজ হয়, তাহলে সামান্য ডাবল ডিম নেওয়া যাবে না কেন। কিন্তু মস্তিষ্ক সঙ্গে সঙ্গে আমাকে মনে করিয়ে দেয়, তোমার হাই কোলেস্টেরল, এ জিনিস তোমার জন্য ভয়াবহ। আমিও কম স্মার্ট নই, আমিও মস্তিষ্ককে স্মরণ করিয়ে দিই বিদেশে এসেছি, প্রতিদিন দশ হাজার স্টেপের বেশি হাঁটা হবে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, দৈনিক দশ হাজার স্টেপ হাঁটলে যা খুশি খাওয়া যাবে, সব কোলেস্টেরল হাঁটার ঠেলায় পানি হয়ে যাবে। তা ছাড়া বিজ্ঞানীদের একটা অংশ এখন বলতে শুরু করেছেন ডিমের কুসুম অবশ্যই খাওয়া যাবে। আমি তাঁদের কথা পুরোপুরি অবশ্য বিশ্বাস করতে পারি না। এদেরকে আমার মাঝে মাঝে আন্তর্জাতিক আন্ডা ব্যবসায়ীদের লবিস্ট বলে মনে হয়।
ফ্রি ব্রেকফাস্টে ডাবল ডিমও নিলাম, আবার স্ক্রাম্বেলড এগও নিলাম বড় দুই চামচ। দুই পিস হোল গ্রেইন ব্রেড নিয়ে টোস্টারে ঢুকালাম আর সেই ফাঁকে বাটার কিউব নিলাম কয়েক পিস (দেশে সারা বছরে বাটার ছুঁয়েও দেখি না), সিদ্ধ করা মিক্সড ভেজিটেবল নিলাম। বেকড হ্যাস ব্রাউন পটেটো নিলাম। ডেনিস পেস্ট্রি উইথ পিচ নিলাম। টমেটো বিন স্টু নিলাম কয়েক চামচ। বারবিকিউ করা বাটন মাশরুম নিলাম কয়েকটা। দুধের সঙ্গে সিরিয়াল নিতে চাইলাম, কিন্তু এতো খেতে পারবো কি না সে সন্দেহে সেটা আপাতত নিলাম না। ভাবলাম, প্রথম পর্বে বিজয়ী হলে দ্বিতীয় পর্বে চান্স নেওয়া যেতে পারে। তবে সেখান থেকে কয়েক পদের নাট আর শুকনো এপ্রিকট, কিশমিশ আলাদা করে একটা বাটিতে নিলাম। চিমটি দিয়ে চিকেন সসেজ নিতে গিয়েও নিলাম না, কেননা মঙ্গোলিয়ান হোটেলে এটা হালাল হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি । দুই রকমের ফ্রেশ ফ্রুটজুস নিলাম আর সঙ্গে একদম ঘোল টাইপের সামান্য নোনতা স্বাদের একটা দুগ্ধজাত পানীয় নিলাম, আরব দেশগুলোতে এটাকে বলে লাবান, এখানে কী বলে কে জানে। তার সঙ্গে নিলাম এক গ্লাস ব্লুবেরি ফ্লেভার্ড ইউগার্ট। ডেসার্ট হিসেবে কী কী খেয়েছিলাম মনে করে পারছি না। মনে করতে চাচ্ছিও না, আর পাঠকদের স্বার্থে অথবা আমার নিজের ইমেজ রক্ষার স্বার্থে সব কিছু এখানে বলে দেওয়া উচিতও না বলে এখন মনে হচ্ছে। কেননা আমরা যারা সর্বদা গ্রিন অ্যান্ড সাস্টেইনেবল নিয়ে জান কোরবান করে দিই তাদের এতো খাওয়া-দাওয়া করা উচিত নয়। মনে রাখতে হবে, যতো ভোগ ততো বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস।
যাই হোক, অনেকটা স্মার্ট জাদুকরের মতোই শীতের সমস্ত জোব্বাজাব্বা পরে, ডজনখানেক পদের ব্রেকফাস্ট আইটেম খেয়ে, চেখে, গিলে ও কিছু আইটেম নাড়াচাড়া করে ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই বাতার গাড়ির কাছে এসে হাজির হলাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা দুজনে বাতার ফোর হুইল ড্রাইভ এসিউভিতে করে যাত্রা শুরু করলাম। বাতা বসেছে গাড়ির ডান দিকে আর আমি বসেছি বাম দিকে; কিন্তু গাড়ি চলছে রাস্তার ডান দিক দিয়ে। আজব দেশ। বরাবরের মতো বাতা নিজেই ড্রাইভার; তবে এবার দল বেঁধে নয়, আমরা মাত্র দুজন চলেছি । দল বেঁধে আড্ডা দিতে দিতে চলার একরকম মজা আর এমন মাত্র দুজনে হালকা নির্ভার মেজাজে গল্প করতে করতে চলার মধ্যে অন্য রকম আনন্দ ।
প্রথম বিশ-ত্রিশ মিনিট চললাম অনেকটা আমাদের টঙ্গী বা ফতুল্লার মতো উপশহর পেরিয়ে । এ এলাকাটা উলানবাটোরের তুলনায় কিছুটা দরিদ্র অঞ্চল, সেটা এদের ঘরবাড়ি আর রাস্তাঘাট দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। এসব উপশহর পার হয়ে একটু পরেই আমরা চলতে লাগলাম এরই মধ্যে পরিচিত হয়ে ওঠা বিস্তৃত সেই কোমল ঢালের হালকা সবুজ তৃণভূমির ভেতর দিয়ে । চোখ যতোদূর যায় শুধু পাতলা ঘাসের কার্পেট। মাইলের পর মাইল, কখনো কখনো শত শত মাইলের মধ্যেও একটি গাছও নেই। এভাবে প্রায় দুইশ কিলোমিটার চলার পর হঠাৎ গাড়ি রাস্তা থেকে নেমে বাঁয়ে বাঁক নিলো । এবার গাড়ি চলছে দিকনির্দেশনাহীন দিগন্ত বিস্তৃত সীমাহীন তৃণভূমির ওপর দিয়ে। এখানে ভূপ্রকৃতির বৈচিত্র্য সেই অর্থে অনেক কম, তবে ভূমির অচিন্তনীয় প্রশস্ততা ও বিশাল বিস্তৃতি পুরো নিসর্গকে অন্য এক অভাবনীয় সৌন্দর্যের মাত্রায় নিয়ে যায়। নৈসর্গিক এই মাত্রা মানুষের আত্মার মধ্যে অন্য রকমের আবহ তৈরি করে। নিজের চোখে না দেখলে সেটা অনুভব করার আর কোনো পথ নেই।
মাহফুজুল হক জগলুল
১১ অক্টোবর, ২০২২


